Advertisement
Advertisement

নোঙর: অজিত দত্তের একটি বিশদ আলোচনা

কবি পরিচিতি: অজিত দত্ত

ভূমিকা: বিশ শতকের তিরিশ-চল্লিশ দশকের আধুনিক বাংলা কবিতার একজন প্রতিভাধর কবি অজিত দত্ত। কবিতা ছাড়াও সমসাময়িক বাংলা কবিতা, ছন্দ, রবীন্দ্র বিষয়ক ভাবনা, বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের রচনার মূল্যায়ন এবং শিশুসাহিত্য বিষয়ে তিনি বহু প্রবন্ধও রচনা করেছেন।

জন্ম ও শৈশব: ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার বিক্রমপুরে এক অভিজাত পরিবারে কবির জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম অতুলকুমার দত্ত এবং মায়ের নাম হেমনলিনী দেবী। অজিত দত্তের মা ছিলেন অত্যন্ত সাহিত্যপ্রেমী। ‘অর্ঘ্য’ নামে তাঁর গান ও কবিতার একটি সংকলন গ্রন্থ আছে। কবিদের পরিবার একসময়ে খুব বিত্তশালী ছিল। তাঁর পিতামহ চন্দ্রকুমার দত্ত ছিলেন সে যুগের রায়বাহাদুর। চার বছর বয়সে কবির বাবার মৃত্যু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই পিতামহেরও মৃত্যু ঘটে। পিতামহের মৃত্যুর পর কবিদের পরিবারে আর্থিক অস্বচ্ছলতা দেখা দেয়। ফলে বেশ অনটনের মধ্যেই কবির শৈশব-কৈশোর কাটে।

ছাত্রজীবন: কবি অজিত দত্ত ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার কিশোরীলাল জুবিলি স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এরপর কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজি অনার্স-সহ বিএ পড়তে শুরু করেন। কিন্তু দাদার মৃত্যু হলে পড়া অসম্পূর্ণ রেখে তাঁকে ঢাকা চলে যেতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে ভরতি হন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত এবং বাংলায় অনার্স-সহ তিনি বিএ পাস করেন এবং ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিভাগে এমএ পাস করেন।

কর্মজীবন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ী অধ্যাপকরূপে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। কিছুদিন পরে তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং প্রথমে রিপন স্কুলে, পরে রিপন কলেজে (বর্তমান নাম সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) শিক্ষকতা করেন। এর মাঝে কিছুদিন সাপ্তাহিক ‘নায়ক’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তারপর আবার রিপন কলেজে বাংলার অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। এখানে তিনি চার বছর অধ্যাপনা করেন। এরপর প্রায় দশ বছর টি-বোর্ডের প্রচার অধিকর্তার কাজ করেন। কিছুদিন তিনি প্রকাশনা ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি নানা সময়ে অল্পদিনের জন্য নানারকম জীবিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি আবার অধ্যাপনার কাজে ফেরেন। চন্দননগর, বারাসাত ও প্রেসিডেন্সি কলেজে বেশ কিছুদিন পড়ান তিনি। সবশেষে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করে সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন।

সাহিত্যজীবন: কবি অজিত দত্তের সতীর্থ বন্ধু ছিলেন কবি বুদ্ধদেব বসু। এই দুই তরুণ যৌথভাবে ‘প্রগতি’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ঢাকা থেকে এটি প্রকাশিত হত। অজিত ছিলেন কল্লোল সাহিত্যগোষ্ঠীর কবি। তিরিশের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় এই বাংলা সাহিত্য পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন কবি। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার সঙ্গে প্রথম থেকেই অজিত দত্ত যুক্ত ছিলেন। অজিত দত্ত ছিলেন আদ্যোপান্ত কবি। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা হল আট। তিনি কুসুমের মাস-এর কবি রূপেই বিখ্যাত। এটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রকাশকাল ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ। এরপর একে একে প্রকাশিত হয়– পাতালকন্যা (১৯৩৮), নষ্ট চাঁদ (১৯৪৫), পুনর্নবা (১৯৪৬), ছড়ার বই (১৯৫০), ছায়ার আলপনা (১৯৫১), জানালা (১৯৫৯) এবং শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘শাদা মেঘ কালো পাহাড়’ (১৯৭০)। এ ছাড়া তাঁর কবিতাবলির সংকলন অজিত দত্তের কবিতা-সংগ্রহ এবং অজিত দত্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা বই দুটিও উল্লেখযোগ্য। রৈবতক ছদ্মনামে তিনি যেসব লঘু প্রবন্ধ লেখেন সেগুলি জনান্তিকে (১৯৪৯) ও মন পবনের নাও (১৯৫১) বইয়ে আছে। বাংলা সাহিত্যে হাস্যরস তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। অজিত দত্ত প্রচুর সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা লিখে গেছেন। সনেট রচনায় তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল।

জীবনাবসান: ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর কলকাতায় কবি অজিত দত্তের জীবনাবসান ঘটে।

কবিতার উৎস

নোঙর কবিতাটি কবি অজিত দত্তের ‘শাদা মেঘ কালো পাহাড়’ নামক কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি কবির সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ। অজিত দত্তের শ্রেষ্ঠ কবিতাগ্রন্থেও নোঙর কবিতাটি স্থান পেয়েছে।

রচনাপ্রসঙ্গ

কবি অজিত দত্তের লেখা নোঙর কবিতাটি তাঁর ‘শাদা মেঘ কালো পাহাড়’ (১৯৭০) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। কবিতাটি অজিত দত্তের শ্রেষ্ঠ। কবিতা’তেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কবি সেই গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন—

আমার প্রথম কবিতার বই যখন প্রকাশিত হয়েছিল, তখনো আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার হইনি। তারপর আরো কয়েকখানি কবিতার বই বেরিয়েছে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভালো লাগা, মন্দলাগা, পছন্দ অপছন্দেরও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। নানা বয়সে নানা বিষয়ে লেখা কবিতাগুলি থেকে বেছে এ বইতে যা দেওয়া হলো, সেগুলি আমার এখনকার বিচারে, কোনো-না-কোনো দিক থেকে আমার প্রতিনিধি-স্থানীয় কবিতা বলে গণ্য করা চলে। এ বিষয়ে পাঠকদের সঙ্গে সবক্ষেত্রে আমার মতের মিল হবে এমন আশা করি না। তবু, আমার বিশ্বাস, এ-বই থেকে পাঠকেরা আমার কবিতা সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা পাবেন। তা হলেই এ বইয়ের উদ্দেশ্য সফল হবে।

সারসংক্ষেপ

নোঙর কবিতায় কবি অজিত দত্তের রোমান্টিক মন দূর সাতসমুদ্রে পাড়ি দিতে চায়। কিন্তু বাস্তবজীবনের তীরের ধারে নোঙর পড়ে গেছে অর্থাৎ কবিমন বাঁধা পড়ে আছে জীবনের দায়দায়িত্ব ও মায়ার বন্ধনে। সুদূরের হাতছানি কবিকে চঞ্চল করে তোলে। সারারাত তিনি দাঁড় টেনে নোঙরের বাঁধন ছিঁড়ে জীবনতরীকে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। নানা স্বপ্ন-কল্পনা-ইচ্ছে জোয়ারের ঢেউয়ের মতো কবির মনের দরজায় মাথা ঠুকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। তারপর আসে ভাটার শোষণ কবি নিরুৎসাহ, নিশ্চেষ্ট, হতাশ হয়ে পড়েন। জোয়ারভাটায় বাঁধা, উত্থানপতনময় এই জগৎসংসারে কবির বাণিজ্যতরি অর্থাৎ জীবন বাঁধা পড়ে আছে। কবি যতই চেষ্টা করুন সংসারের বাঁধন ছেড়ার যতই স্বপ্ন দেখুন বাঁধনমুক্ত জীবনের, গৃহী কবির জীবন বন্ধনময় হয়েই থেকে যায়। সময়ের স্রোত তাঁকে বিদ্রুপ করে। তবু কবির স্বপ্ন দেখা থামে না। স্থির গণ্ডিবদ্ধ জীবন থেকে মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং সেই আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থাকার বেদনা নোঙর কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে।

কবিতাটি একটি রূপক কবিতা। কিছু শব্দের রূপক অর্থ—

  • সিন্ধুপার– অনির্দ্দেশ্য লোক, বন্ধনমুক্তি
  • নৌকা– জীবন তরি
  • নোঙর– দায়িত্ব, কর্তব্য, দায়বদ্ধতা
  • ঢেউ– স্বপ্ন, সাধ, আশা, আকাঙ্ক্ষা, বাসনা
  • ভাঁটার শোষণ– বাস্তবের অভিঘাত
  • বাণিজ্য তরী– কবির সৃষ্টিকর্ম, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান
  • দাঁড়– নিরন্তর প্রয়াস
  • তট– গণ্ডি বদ্ধতার পরিধি।
  • জোয়ার-ভাটা– জীবনের উত্থান পতন

নামকরণ

শিরোনামে কবিতার মূলভাব বা ব্যঞ্জনার আভাস পাওয়া যায়। অজিত দত্তের নোঙর কবিতাটির নামকরণও সেই দিক দিয়ে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কবি নৌকা নিয়ে সুদূর সমুদ্রে পাড়ি দিতে চান, কিন্তু কখন যেন তাঁর নৌকার নোঙর পড়ে গেছে কূলের ধারে—

পাড়ি দিতে দূর সিন্ধুপারে নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে।

তাই মাস্তুলে পাল বেঁধে দাঁড় টানলেও নৌকা এগোয় না। মানুষের জীবনও নৌকার মতো সৃষ্টিশীল মন সমস্ত বন্ধন ছিঁড়ে চলে যেতে চান বাস্তব থেকে অনেক দূরের জগতে। কিন্তু সম্পর্কের, কর্মের, দায়িত্ব কর্তব্য বোধের নোঙরে তা বাঁধা পড়ে থাকে। কবির সৃষ্টিশীল মনেও এমন সংঘাত চলে আজীবন। তাঁর কবিসত্তা দৈনন্দিন জীবনযাপনের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিতে চায় না। তা সীমা থেকে বেরোনোর জন্য ছটফট করে। ফারসি শব্দ ‘লঙ্গর’ থেকে আসা নোঙর শব্দটির অর্থ নৌকা বেঁধে রাখার ভারী বস্তুবিশেষ। আলোচ্য কবিতাতেও নোঙর হয়ে উঠেছে জীবনের বন্ধনের প্রতিশব্দ। তাই শিরোনামটি অত্যন্ত ব্যঞ্জনাধর্মী এবং যথাযথ।

অজিত দত্তের নোঙর কবিতাটি একটি রূপকধর্মী কবিতা। এই কবিতায় কবি নোঙরকে জীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কবি মনে করেন, জীবনে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

নোঙর কবিতার ছবি

নোঙর: অজিত দত্ত

১. নোঙর (কবিতা) অজিত দত্ত – নবম শ্রেণীর বাংলা প্রশ্ন ও উত্তর:

MCQ

  1. ১.১ তরী ভরা পণ্য’ শব্দবন্ধটি প্রতীকায়িত করে—

    উত্তর: জীবনের সঞ্চয়কে।

  2. ১.২ দাঁড় টানার মূল কারণ হল —

    উত্তর: নৌকার অগ্রগমন অব্যাহত রাখা।

  3. ১.৩ ‘নোঙর কখন জানি পড়ে গেছে তটের কিনারে। এখানে নোঙর পড়ে গেছে কথকের —

    উত্তর: অজ্ঞাতে।

  4. ১.৪ ‘নোঙর’ কবিতাটিতে নোঙর হল —

    উত্তর: মানবজীবনের অলঙ্ঘ্য বন্ধনের প্রতিভূ।

  5. ১.৫ “সারারাত তবু দাঁড় টানি” —এ খানে ‘সারারাত’এর অর্থ —

    উত্তর: সমগ্র জীবন।

  6. ১.৬ ‘নোঙর’ কবিতাটির রচয়িতা হলেন —

    উত্তর: অজিত দত্ত।

  7. ১.৭ ‘নোঙর’ কবিতাটি যে-কাব্যগ্রন্থ থেকে গৃহীত, তা হল-

    উত্তর: শাদা মেঘ কালো পাহাড়।

  8. ১.৮ ‘নোঙর’ শব্দের অর্থ কী?

    উত্তর: বড়শি আকৃতির লৌহনির্মিত যন্ত্র।

  9. ১.৯ কবি যা পার হচ্ছিলেন, তা হলো

    উত্তর: সিন্ধু।

  10. ১.১০ কবির যেখানে পাড়ি দিতে হবে,—

    উত্তর: সিন্ধুপারে।

  11. ১.১১ কবির নোঙর যেখানে পড়ে গিয়েছে, তা হলো —

    উত্তর: তটের কিনারে।

  12. ১.১২ কবির তাঁর দাঁড় টানাকে মনে করেছেন—

    উত্তর: মিছে।

  13. ১.১৩ কথক মিছে দাঁড় টানেন-

    উত্তর: সারারাত।

  14. ১.১৪ ‘মিছে দাঁড় টানি’-র অন্তর্নিহিত অর্থ হল —

    উত্তর: নিষ্ফল প্রচেষ্টা।

  15. ১.১৫ ঢেউগুলি যেখানে মাথা ঠুকছে —

    উত্তর: তরিতে।

  16. ১.১৬ জোয়ারভাটায় যা বাঁধা আছে, তা হলো —

    উত্তর: বাণিজ্যতরি।

  17. ১.১৭ “জোয়ার-ভাঁটায় বাঁধা এ-তটের কাছে” – এখানে ‘জোয়ার-ভাঁটা’ হল —

    উত্তর: জীবনের উত্থানপতনের প্রতীক।

  18. ১.১৮ আমার বাণিজ্য-তরী বাঁধা পড়ে আছে।’—কোথায় বাঁধা পরে আছে?-

    উত্তর: তটের কাছে।

  19. ১.১৯ ‘নোঙরের কাছি বাঁধা তবু এ নৌকা চিরকাল।’ — ‘কাছি’ বলতে বোঝানো হয় —

    উত্তর: মোটা দড়ির গুচ্ছ।

  20. ১.২০ “ততই বিরামহীন এই দাঁড় টানা।” — এই বিরামহীনতার কারণ কি?

    উত্তর: বন্ধনমুক্তির অনিঃশেষ আকুতি।

Advertisement

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

  1. ২.১ ‘নোঙর’কবিতায় ‘নোঙর’ ও ‘নৌকা’ কীসের প্রতীক?

    উত্তর: কবিতাটিতে নৌকা গতিশীল জীবন এবং নোঙর বন্ধন বা আবদ্ধতার প্রতীক।

  2. ২.২ নৌকায় দাঁড় ও পালের কার্যকারিতা কী?

    উত্তর: পাল বাতাসের গতিকে কাজে লাগিয়ে আর দাঁড় জল কেটে নৌকাকে এগিয়ে নিয়ে চলে।

  3. ২.৩ ‘নোঙর’ কবিতায় কবিতার কথকের কোন মূল মনোভাবটি ফুটে উঠেছে?

    উত্তর: ‘নোঙর’ কবিতায় গণ্ডিবদ্ধ জীবনের আবদ্ধতার বিপরীতে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার আকুতি প্রকাশিত হয়েছে।

  4. ২.৪ ‘নোঙর’ কবিতাটি কার লেখা?

    উত্তর: ‘নোঙর’ কবিতাটি কবি অজিত দত্তের লেখা।

  5. ২.৫ ‘নোঙর’ কবিতাটি কোন্ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?

    উত্তর: ‘নোঙর’ কবিতাটি কবি অজিত দত্তের ‘শাদা মেঘ কালো পাহাড়’ নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

  6. ২.৬ ‘ততই বিরামহীন দাঁড় টানা’—দাঁড় টানা বিরামহীন কেন?

    উত্তর: নৌকাকে নোঙরের কাছি থেকে মুক্ত করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশায় কথকের দাঁড় টানা বিরামহীন হয়।

  7. ২.৭ কবি কীভাবে সপ্তসিন্ধুপারে পাড়ি দিতে চান?

    উত্তর: কবি তরিভরা পণ্য নিয়ে সপ্তসিন্ধুপারে পাড়ি দিতে চান।

  8. ২.৮ ‘নোঙর’ শব্দের অর্থ কী?

    উত্তর: বড়শি আকৃতির লোহার তৈরি যন্ত্র, যা নৌকাকে তটের কিনারে আটকে রাখে, তাকেই নোঙর বলে।

  9. ২.৯ ‘নোঙর’ কবিতায় নোঙর কীসের রূপক?

    উত্তর: ‘নোঙর’ কবিতায় নোঙর গণ্ডিবদ্ধ জীবনের আবদ্ধতার রূপক।

  10. ২.১০ ‘নোঙর’ কবিতায় কথক কোথায় পাড়ি দিতে চেয়েছেন?

    উত্তর: নোঙর কবিতায় কথক সুদূর সিন্ধুপারে পাড়ি দিতে চেয়েছেন।

  11. ২.১১ কবি সিন্ধুতীরে পাড়ি দিতে পারছেন না কেন?

    উত্তর: কবির নোঙর তটের কিনারে পড়ে যাওয়ায় কবি সিন্ধুতীরে পাড়ি দিতে পারছেন না।

  12. ২.১২ কবি সিন্ধুতীরে সিন্ধুতীরে পাড়ি দিতে চান কেন?

    উত্তর: কবি তার জীবনের সংকীর্ণতাকে ভাঙার জন্য বাণিজ্যতরী নিয়ে সিন্ধুতীরে পাড়ি দিতে চান।

  13. ২.১৩ ‘সারারাত মিছে দাঁড় টানি।—সারারাত মিছে দাঁড় টেনেছেন কেন?

    উত্তর: তটের কিনারে নৌকার নোঙর পড়ে গিয়েছে, তাই কবি সারারাত মিছে দাঁড় টেনেছেন।

  14. ২.১৪ কবিতার কথক কীভাবে দিকের নিশানা ঠিক করার চেষ্টা করেন?

    উত্তর: কবিতার কথক আকাশের তারার পানে চেয়ে দিকের নিশানা ঠিক করার চেষ্টা করেন।

  15. ২.১৫ ‘নোঙর’ কবিতায় কীসের বিরাম নেই?

    উত্তর: নৌকাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশায় দাঁড় টানার বিরাম নেই।

Advertisement

সংক্ষিপ্ত বা ব্যাখ্যাভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর

  1. ৩.১ “আমার বাণিজ্য-তরী বাঁধা পড়ে আছে।”— কথাটির তাৎপর্য লেখাে।

    উত্তর: কবি তার রচিত সাহিত্যকীর্তিগুলি নিয়ে ভেসে যেতে চান দূরে- দূরান্তরে। সাতসমুদ্রের পাড়ের সেই সুদূর জগতে কবি মেতে উঠবেন সৃষ্টিশীল কাব্যরচনায়। সংসারের বাঁধন ছিন্ন করে কবি চলে যাবেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। এই আশায় কবি প্রতিদিন বুক বাঁধেন, যেন তিনি নৌকার দাঁড় টেনে গন্তব্যে চলেছেন৷ কিন্তু, পরমুহূর্তেই তার মনে পড়ে যায়, বাস্তব জীবন ও সংসারের দায়িত্ব কর্তব্য ত্যাগ করে তিনি কোনােদিনই গন্তব্যে যেতে পারবেন না। তাই গভীর হতাশার সাথে কবি আলােচ্য উক্তিটি করেছেন।

  2. ৩.২ “স্রোতের বিদ্রুপ শুনি প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে” — ‘স্রোতের বিদ্রুপ’ বলতে কবি কী বােঝাতে চেয়েছেন?

    উত্তর: কবি নৌকা নিয়ে দূর সমুদ্রে পাড়ি দিতে চান। কিন্তু তার সেই নৌকো তটের কিনারে নােঙরে বাঁধা পড়ে গেছে। কবির মন বাধা অগ্রাহ্য করে দাঁড় টেনে চলে। প্রতিবার দাঁড় টানলে যে শব্দ ওঠে তা যেন স্রোতের ঠাট্টা-উপহাস। স্রোত গতিশীল, কিন্তু কবির জীবনতরি আটকা পড়ে আছে। কবি চাইলেও সাংসারিক বন্ধন ছিন্ন করে সুদূরের আহ্বানে নৌকা ভাসাতে পারছেন না। তাই স্রোত কবির এই থমকে থাকাকে ব্যঙ্গবিদ্রুপে বিদ্ধ করে চলে।

  3. ৩.৩ “নােঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে।”—মন্তব্যটির তাৎপর্য।

    উত্তর: কবি সুদূরের পিয়াসি৷ তার মধ্যে একটি চঞ্চল মন আছে, যেটি অজানা-অচেনার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে চায় দূর সমুদ্রপারে। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তিনি নানা কর্মের বন্ধনে বাঁধা পড়ে আছেন। সংসারের বিভিন্ন দায়িত্ব- কর্তব্যে তার দৈনন্দিন জীবন বাঁধা। কবির রােমান্টিক মন সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি চায়, ছুটে যেতে চায় স্বপ্ন-কল্পনার মায়াবী জগতে। কিন্তু মন চাইলেও বাস্তবকে উপেক্ষা করে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়।

  4. ৩.৪ “সারারাত মিছে দাঁড় টানি”—দাঁড় টানাকে কবি মছে বলেছেন কেন?

    উত্তর: যে স্বপ্নময় রূপকথার দেশের কল্পনা কবির মনকে প্রতি মুহূর্তে চঞ্চল করে তােলে, বাস্তবে কবির পক্ষে সেখানে পৌঁছােনাে সম্ভব হয় না। তবু কবির সুদূর পিয়াসি মন আশায় বুক বেঁধে সারারাত ধরে কল্পনার জাল বুনে চলে। কিন্তু কবির সচেতন সত্তা জানে, ‘নােঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে’। অর্থাৎ জীবনের নৌকা দায়দায়িত্বপূর্ণ কর্মমুখর সংসারে বাঁধা পড়েছে। সে নৌকা আর চলবে না। তাই দাড় টানা বৃথা।

বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

  1. ৪.১ ‘নােঙর’ একটি প্রতীকী কবিতা-আলােচনা করাে।

    উত্তর: প্রতীককে ইংরেজিতে বলে Symbol টিহ। যখন মনের ভাবকে প্রকাশ করে, তখন তাকে বলে প্রতীক। কবি অজিত দত্তর ‘ নােঙর’ কবিতায় নানা প্রতীকে হৃদয়ের অনুভূতির ব্যঞ্জনা ধরা পড়েছে। ‘নােঙর’-কে তিনি বন্ধনের প্রতীকরূপে আর পরিচিত বাস্তবজগৎকে নদীর তটের প্রতীকরূপে ব্যবহার করেছেন। বাস্তব প্রয়ােজনের জগতের বাইরের জগৎকে তিনি ‘দূর সিন্ধুপার’ বা ‘সপ্তসিন্ধুপার’ বলে অভিহিত করেছেন। সেই বহুদূর কায়নিক জগতে পাড়ি দিতে চেয়েও কবির জীবন-নৌকা নােঙরে বাঁধা পড়েছে। জোয়ারের ঢেউগুলি কবির জীবনের স্বপ্ন-আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক নৌকায় মাথা ঠুকে অর্থাৎ কবির মনের দরজায় মাথা ঠুকে ব্যর্থ হয়ে তারা সমুদ্রের দিকে ছুটে যায়। সেই দূর সমুদ্রে পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন কবিও। কাছি যেন বাস্তবজীবনের নানা সম্পর্কের সূত্র। জোয়ারভাটা হল জীবনের উত্থানপতন, আশা-নিরাশার প্রতীক। নােঙর যেমন স্থিতি বা বন্ধন, তেমনি স্রোত হল। গতির প্রতীক। ‘বাণিজ্য’, ‘পণ্য’ এগুলি হল লাভক্ষতিময় জীবন-জীবিকা ও সৃষ্টিসম্পদের প্রতীক। এভাবেই প্রতীকের সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে কবিতার ব্যঞ্জনা। তাই সবদিক বিচার করে নােঙর’-কে একটি আদর্শ প্রতীকী কবিতা বলা যায়।

  2. ৪.২ ‘নোঙর’ কবিতাটির নামকরণের তাৎপর্য আলোচনা করো।

    উত্তর: ‘নোঙর শব্দটি এসেছে ফারসি ‘লঙ্গর’ শব্দ থেকে। নৌকাকে জলের মধ্যে বেঁধে রাখার ভারী বস্তুবিশেষকে নোঙর বলা হয়। শিকল বা কাছির সঙ্গে লোহার এই নোঙর বেঁধে জলের নীচে ফেলে কাছির অন্য প্রান্ত দিয়ে নৌকা বেঁধে রাখা হয়। কবি অজিত দত্তের আলোচ্য কবিতা ‘নোঙর’-এর মাধ্যমে মানবজীবনের বন্ধনের কথা বলা হয়েছে। মানুষের জীবনও নৌকার মতো – সম্পর্কের, কর্মের, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধের নোঙরে তা বাঁধা পড়ে থাকে। যারা ভাবুক, সৃষ্টিশীল ও রোমান্টিক মনের মানুষ, তাঁরা জীবনের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে বাস্তব থেকে দূরে চলে যেতে চান মাঝে মাঝে। তাঁদের মনের স্বপ্ন-কল্পনার জগৎ ও কথিন বাস্তব জগতের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। কবির সৃষ্টিশীল মনেও এমনই সংঘাত চলে। সুদূরের আহ্বানকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না, আবার দৈনন্দিন জীবনের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরোতেও পারেন না। তাঁর জীবন যেন নোঙরে বাঁধা পড়া এক নৌকা। তাই এ কবিতায় নোঙর হল বন্ধনেরই প্রতিশব্দ। সেদিক থেকে বিচার করলে আলোচ্য কবিতাটির ‘নোঙর’ নামটি সার্থক ও যথাযথ।

  3. ৪.৩ ‘নোঙর’ কবিতায় স্থিতি ও গতির চিত্র কীভাবে ধরা পড়েছে বুঝিয়ে দাও।

    উত্তর: কবি অজিত দত্ত রচিত ‘নোঙর’ কবিতায় স্থিতি ও গতির চিত্র সুচারুভাবে আঁকা হয়েছে। সমগ্র কবিতায় ছড়িয়ে আছে স্থিতি ও গতির নানা অনুষঙ্গ। স্থিতি ও গতির দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত মানবহৃদয়ের চিত্র তুলে ধরা আলোচ্য কবিতার অন্যতম ভাববস্তু। বাস্তব জগতের পরিচিত জগতের সীমানায় কবির মন আবদ্ধ থাকতে চায় না। তরি নিয়ে তিনি সাতসমুদ্রপারে যাত্রা করতে চান। কিন্তু অজান্তেই কখন যেন সেই তরি স্থিতিশীলতা নোঙরের কাছিতে বাঁধা পড়ে গেছে—‘নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে। নোঙর আর তটের উল্লেখের মাধ্যমে কবি বাস্তবজগতের স্থিতিশীলতার চিত্র তুলে ধরেছেন। নিশ্চল নৌকাও স্থিতিকেই চিহ্নিত করে। অন্যদিকে জোয়ারের ঢেউগুলি গতির বার্তা নিয়ে আসে। কবির নিশ্চল জীবনে অভিঘাত হেনে তাকে সচল করতে চায়। তরি তবু চলে না। বদ্ধ তরিতে মাথা ঠুকে অভিমানী ঢেউগুলি ফিরে যায় গতির জগতে। জোয়ারভাটা আসে যায়। নদী আর সমুদ্রের স্রোত চিরচল, গতিশীল তেমন, কবির রোমান্টিক মনও গতিশীল। কিন্তু বাস্তবতার স্থবির পটভূমিতে কবি অসংখ্য বন্ধনে বন্দি, তাঁর জীবনতরি গতিহারা। রাতের নিস্তব্ধ নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলি কবির জীবনে গতির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। সারারাত তিনি অবিরাম নিক্ষেপ করে চলেন দাঁড়। কিন্তু তাঁর ব্যর্থ প্রচেষ্টাকে বিদ্রুপ করে স্রোত—“নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি সাগরগর্জনে ওঠে কেঁপে, স্রোতের বিদ্রুপ শুনি প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে।” দাঁড় টেনে টেনে, পাল তুলে, তারার দিকে চেয়ে নিশানা স্থির গতির বার্তা করেও কবি দূর সমুদ্রপারে পাড়ি দিতে ব্যর্থ হন। এই ব্যর্থতার বেদনায় বিষণ্ণ কবি গতিশীল জীবনধর্মে দীক্ষিত বলেই জীবনের কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছনোর আশায় তবু দাঁড় টেনে যান। এভাবেই ‘নোঙর’ কবিতার চিরকালীন গতিময়তার কথা ব্যঞ্জিত হয়েছে।

  4. ৪.৪ ‘নোঙর’ কবিতা অবলম্বনে কবির সমুদ্রযাত্রার উদ্যোগ এবং ব্যর্থতার পরিচয় দাও।

    উত্তর: ‘নোঙর’ কবিতায় রোমান্টিক কবি অজিত দত্তের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছোনোর অভীপ্সা প্রকাশিত হয়েছে। পারিপার্শ্বিক বন্ধনের সীমানা পেরিয়ে তিনি চলে যেতে চান সমুদ্রযাত্রার উদ্যোগ সপ্তসিন্ধুপারে। জলপথে কবির যাত্রা, তাই নৌকা প্রস্তুত রেখেছেন। সেই নৌকায় সারাজীবনের সঞ্চয় বোঝাই করেছেন, মাস্তুলে পাল বেঁধেছেন, হাতের মুঠোয় ধরেছেন দাঁড়। -“পাড়ি দিতে দূর সিন্ধুপারে নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে।”কিন্তু নিজের অজান্তে কখন তটের কিনারে নোঙর পড়ে গেছে। কবির সমদূরপিয়াসী মন বাঁধা পড়ে গেছে অদৃশ্য জাগতিক বন্ধনে। গতিশীল জীবনধর্মে দীক্ষিত আশাবাদী কবি থেমে থাকতে চান না, প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করতে তিনি অবিরত জীবনতরীর দাঁড় টানেন। যাত্রার মুহূর্তে দাঁড় বাইতে গিয়ে কবি অনুভব করেন নিজেরই অজান্তে কখন নোঙর পড়ে গেছে তটের কিনারে। কিন্তু তাঁর মন এই বন্ধনকে মেনে নিতে চায় না। তাই কবি সারারাত মিছে দাঁড় টানেন। জোয়ারভাটায় বাঁধা জীবনের এ তটে কবি নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকেন। তাঁর চোখের সামনে ঢেউগুলি দুরন্ত গতির বার্তা নিয়ে আসে আর সাড়া না পেয়ে ফিরে যায়। চঞ্চল স্রোত কবির স্থবিরতাকে বিদ্রুপ করে। নিস্তব্ধ রাতে কবি অবিরাম দাঁড় টেনে চলেন। বারবার ব্যর্থ হয়েও তিনি গন্তব্যে পৌঁছোনোর আশা ও চেষ্টা ত্যাগ করেন না। কিন্তু তিনি জানেন এই দাঁড় টানা মিছে বা বৃথা। অসহায়, নিরুপায় কবির মন ব্যর্থতার বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে।

  5. ৪.৫ “নােঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে” — ‘নােঙর’ এখানে কীসের প্রতীক? কবি নৌকা নিয়ে কোথায় যেতে চান? কবির আকাঙ্ক্ষা ও আক্ষেপ কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে?

    উত্তর: কবি অজিত দত্ত রচিত ‘নােঙর’ কবিতায় নােঙর হল জীবনের বিভিন্ন বন্ধন বা স্থিতিশীলতার প্রতীক। কবি নৌকা নিয়ে যেতে চান সুদূর সাতসাগরের পাড়ে৷ বাস্তব জীবনের বাধাবন্ধন থেকে অনেক দূরে কল্পনালােকে পাড়ি দিতে চান কবি। মধ্যযুগের সওদাগরদের মতাে কবি ভাসিয়ে দিতে চান তার সৃষ্টিসম্পদে ভরা নৌকা। রােজকার একঘেয়ে জীবনযাপন থেকে ছুটি নিয়ে তার কল্পনাপ্রবণ মন দূর অচেনা অজানা দেশে পাড়ি দিতে চায়।। কবির আকাঙ্ক্ষা সাতসমুদ্রপাড়ে পাড়ি দেওয়ার। কবির ভাবুক মন সংসারের দায়িত্ব কর্তব্যের বাঁধন মানতে চায় না। কর্মময়, সাংসারিক জীবনের বাঁধন তাকে কঠিনভাবে বেঁধে রাখে। স্রোতের গতি কবির এই দায়িত্বের বন্ধনকে বিদ্রুপ করে, কিন্তু কবি নিরুপায়, অসহায়। এই দাঁড় টানা বৃথা জেনেও তিনি অবিরাম দাড় টেনে চলেন। তাই কবির তীব্র আক্ষেপ

    “তরী ভরা পণ্য নিয়ে পাড়ি দিতে সপ্তসিন্ধুপারে,
    নােঙর কখন জানি পড়ে গেছে তটের কিনারে।
    সারারাত তবু দাঁড় টানি, তবু দাড় টানি।।”

    এভাবেই ‘নােঙর’ কবিতাটি কবির আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা ও আক্ষেপের বেদনায় ধূসর হয়ে উঠেছে।

  6. ৪.৬ “সারারাত তবু দাড় টানি”—কবি সারারাত দাড় টানেন কেন? ‘দাড়’ কথাটি বলার কারণ কী? এই দাঁড় টানার মধ্য দিয়ে কবির কোন্ মানসিক অবস্থার পরিচয় ফুটে ওঠে?

    উত্তর: কবি অজিত দত্ত ‘নােঙর’ কবিতায় বলেছেন যে নৌকাভরা পণ্য নিয়ে তিনি সাতসাগরের পাড়ে পাড়ি দিতে চান। তাই তিনি সারারাত দাঁড় টানেন। ‘তবু’ শব্দের অর্থ ‘তা সত্ত্বেও’ পণ্যভরা নৌকা নিয়ে সাতসাগরপারে যাওয়ার বাসনা ছিল কবির। কিন্তু কখন তটের কিনারে নােঙর পড়ে গেছে তিনি বুঝতেও পারেননি। নৌকা যে আর তট ছেড়ে যাবেনা কখনও, তা তিনি জানেন। তবু মন যেন এই সত্য মানতে চায় না। কঠিন সত্যটি জানা সত্ত্বেও কবি সারারাত দাঁড় টেনে চলেন। এই কারণেই ‘তবু কথাটি বলা হয়েছে। এই দাঁড় টানার মধ্য দিয়ে কবির অদম্য মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি জানেন, সমাজ-সংসারের নানা বন্ধন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। তবু তার কল্পনাবিলাসী মন বাঁধনহারা জীবনের স্বাদ পেতে চায়। তার চারপাশ বাস্তব। বলে এই দাঁড় টানা বৃথা, কিন্তু তার অবচেতন মন আশা-স্বপ্নের জাল বুনে চলে। তাই তিনি অবিরাম দাড় টেনে চলেন। কবি জানেন, তার বাসনা হয়তো কোনােদিনই পূরণ হবে না, তবু স্বপ্নময় জীবনের অনুসন্ধানে তার ক্লান্তি নেই। দূর সাগরে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।

সমস্ত সমাধান আমাদের বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা WBBSE নির্দেশিকা অনুসারে প্রস্তুত করা হয়েছে। সমাধানগুলিতে পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নের উত্তর, ব্যাকরণ অনুশীলন এবং লেখার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
Advertisement

Complete Bengali Solutions কিনুন

অফলাইন অধ্যয়নের জন্য সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তর PDF ফরম্যাটে পান

Advertisement