ভাঙার গান - কাজী নজরুল ইসলাম
নবম শ্রেণীর বাংলা কবিতার সম্পূর্ণ সমাধান
ভাঙার গান: কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিশদ আলোচনা
কবি পরিচিতি: কাজী নজরুল ইসলাম
ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতা ও গানের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা ছাড়াও সমাজের যাবতীয় অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি বিদ্রোহ করেছেন। তিনি সমাজের নারীমুক্তির কথা বলেছেন, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা করেছেন।
জন্ম ও শৈশব: কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে। তাঁর বাবার নাম কাজী ফকির আহমেদ, মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। মাত্র আট বছর বয়সে নজরুল তাঁর বাবাকে হারান। ফলে জীবনের শুরু থেকেই তাঁকে কঠোর দারিদ্রের মুখোমুখি হতে হয়।
ছাত্রজীবন: গ্রামের তাঁর লেখাপড়া শুরু হয়। দশ বছর বয়সে নিম্নপ্রাথমিক পরীক্ষায় পাস করে তিনি ওই মক্তবেই এক বছর শিক্ষকতা করেন। পরে ঘটনাচক্রে তিনি পূর্ববাংলার ময়মনসিংহের কাজীর সিমলা গ্রামের নিকটবর্তী দরিরামপুর বিদ্যালয়ে ভরতি হন। কিন্তু সেখানে তিনি বেশিদিন থাকেননি। ফিরে এসে তিনি ভরতি হন বর্ধমান জেলার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয় থেকে সপ্তম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ভরতি হন বর্ধমান জেলার রানিগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ উচ্চবিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয়ে নজরুল অত্যন্ত মেধাবী ছাত্ররূপে পরিচিত ছিলেন। এখান থেকেই তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। নজরুলের প্রথাগত শিক্ষাজীবনের এখানেই সমাপ্তি।
কর্মজীবন: অল্প বয়স থেকেই নজরুল সাধু-সন্ন্যাসী-বাউলদের সঙ্গ পছন্দ করতেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি গান-কাহিনি রচনা করে অর্থ উপার্জন করেছেন। নিজের লেখা গানে সুরও দিতেন তিনি নিজে। একসময়ে আসানসোলের একটি রুটির দোকানে মাসিক পাঁচ টাকা বেতনে কাজ করেছেন নজরুল।
ব্যক্তিজীবন: ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রমীলা সেনগুপ্তের সঙ্গে নজরুলের বিবাহ হয়। শুধু কবি হিসেবে নয়, তিনি গায়ক, গীতিকার ও সুরকার হিসেবেও সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। অভিনেতা ও কাহিনিকার রূপে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে নির্বাক হয়ে পড়েন। স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হলে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে যান।
সাহিত্যজীবন: ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা 'মুক্তি' প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে নজরুল লেখালেখির ক্ষেত্রে আরও মনোযোগী হয়ে পড়েন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে নজরুল সেনাবাহিনী ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ভারত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতা। এই কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বৃহত্তর পাঠকসমাজে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগুলি হল- অগ্নিবীণা (১৯২২), দোলনচাপা (১৯২৩), বিষের বাঁশি (১৯২৪), ভাঙার গান (১৯২৪), প্রলয়শিখা (১৯২৪), সাম্যবাদী (১৯২৬), সর্বহারা (১৯২৬), ফণিমনসা (১৯২৭), সিন্ধু-হিন্দোল (১৯২৭), ঝিঙেফুল (১৯২৮), জিঞ্জীর (১৯২৮), সন্ধ্যা (১৯২৯) প্রভৃতি। গল্প-সংকলন- ব্যথার দান (১৯২২), রিক্তের বেদনা, (১৯২৪) এবং শিউলি মালা (১৯৩১) নামে তাঁর তিনটি গল্প-সংকলন আছে। উপন্যাস-তিনি বাঁধনহারা (১৯২৭), কুহেলিকা (১৯২৭), মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩০) প্রভৃতি কয়েকটি উপন্যাস রচনা করেন। নজরুলের বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত কবিতা সংকলনটির নাম সঞ্চিতা। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ধূমকেতু পত্রিকা। এই পত্রিকায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরেন। স্বদেশভাবনা প্রচারের জন্য ব্রিটিশ সরকার কিছুদিনের মধ্যেই পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। রাজদ্রোহের অপরাধে নজরুল এক বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুক্তি লাভ করেন।
সম্মান ও স্বীকৃতি: ভারত সরকার কাজী নজরুল ইসলামকে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে 'পদ্মভূষণ' উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে 'জাতীয় কবির' মর্যাদা দেন এবং তাঁকে 'একুশে পদক' দিয়ে সম্মানিত করেন।
জীবনাবসান: ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট ঢাকায় কবির জীবনাবসান ঘটে এবং সেখানেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
উৎস
'ভাঙার গান' কবিতাটি 'ভাঙার গান' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
সারসংক্ষেপ
দেশকে স্বাধীন করার জন্য যাঁরা প্রতিজ্ঞা করেছেন তাঁদের কারাগারে বন্দি করেছে ইংরেজ সরকার। কবি দেশের তরুণদের কারাগারের লোহার দরজা ভেঙে নিশ্চিহ্ন করে দিতে বলেছেন। শৃঙ্খলে আবদ্ধ বিপ্লবীদের জমাটরক্ত লেগে আছে কারাগারের বেদিতে। তরুণ দেশপ্রেমীদের কবি শিবের সঙ্গে তুলনা করে ধ্বংসের দব্জা বাজাতে বলেছেন। কারাগারের প্রাচীর ভেদ করে ধ্বংসের পতাকা উড়ুক—এটাই কবির ইচ্ছা। কেউ মালিক, কেউ রাজা নয়, আমরা সবাই সমান এবং স্বাধীন—এই মনোভাব নিয়ে গাজনের বাজনা বাজিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার ডাক দিয়েছেন কবি। সত্য হল মুক্ত ও স্বাধীন, তাকে কেউ শাস্তি দিতে পারে না। ইংরেজরা ভগবানকে ফাঁসি দিতে চায়— এমন কথা শুনলে কবির হাসি পায়। কারণ ভগবান অমর, স্বাধীনতা সংগ্রামীরাও মৃত্যুঞ্জয়ী। ভগবানকে ফাঁসি দেওয়ার মতো সর্বনাশা ভুল ইংরেজ শাসককে কারা বা কে দেয় ? কবি দেশের তরুণদের এই বলে উৎসাহ দিয়েছেন যে তারা যেন খ্যাপা ভোলানাথের মতো প্রলয়দোলা দিয়ে হ্যাঁচকা টানে কারাগারগুলো ভেঙে দেয়। যুদ্ধের ভেরি কাঁধে তুলে নিতে কবি যুবশক্তিকে ডাক দিয়েছেন। মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে দেশের মুক্তির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করার বার্তা দিয়েছেন কবি। কালবৈশাখী ঝড়ের মতো উত্তাল দেশের পরিস্থিতি। এখন চেষ্টা না করে বসে থেকে সময় নষ্ট না করে ভয়ংকর কারাগারের ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে হবে। লাথি মেরে ভাঙতে হবে তালা, বন্দিশালা গুলোতে আগুন জ্বালাতে হবে, উপড়ে ফেলতে হবে সমস্ত বন্ধন।
নামকরণ
'ভাঙার গান' কাব্যগ্রন্থের প্রথম রচনাটির নাম 'ভাঙার গান'। অসহযোগ আন্দোলনের সময় রচিত। এ গানে প্রায় দুশো বছরের ইংরেজ অপশাসনকে ভাঙার কথা বলা হয়েছে। সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ইংরেজ কারাগারে বন্দি বিপ্লবীদের মুক্ত করবেন এবং সমগ্র স্বদেশকে বিদেশি শাসকের কবল থেকে মুক্তি দেবেন এমন দুর্বার সংকল্প আলোচ্য গানে প্রকাশিত হয়েছে। সমগ্র গানে ধ্বংস তথা ভাঙার সুর ধ্বনিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনে সমগ্র ভারতবর্ষই যেন এক বন্দিশালায় পরিণত হয়েছে। সেই বন্দিদশা থেকে দেশবাসীকে মুক্ত হতে হবে সশস্ত্র বিপ্লব ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। স্বাধীন দেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রথমে ভাঙতে হবে পরাধীনতার শৃঙ্খল। সেই ভাঙনের আহ্বানই রয়েছে আলোচ্য গানটিতে। তাই এ গানের শিরোনাম 'ভাঙার গান' যথার্থ ও সার্থক হয়েছে।
ভাঙার গান: কাজী নজরুল ইসলাম
১. ভাঙার গান (কবিতা) কাজী নজরুল ইসলাম – নবম শ্রেণীর বাংলা প্রশ্ন ও উত্তর:
MCQ
- ১.১ ‘ভাঙার গান’ কবিতাটি কার লেখা?
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলাম।
- ১.২ ‘ভাঙার গান’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
উত্তর: ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থ।
- ১.৩ কবি দেশের তরুণদের কী ভাঙতে বলেছেন?
উত্তর: কারাগারের লোহার দরজা।
- ১.৪ শৃঙ্খলে আবদ্ধ বিপ্লবীদের কী লেগে আছে কারাগারের বেদিতে?
উত্তর: জমাটরক্ত।
- ১.৫ কবি তরুণ দেশপ্রেমীদের কার সঙ্গে তুলনা করেছেন?
উত্তর: শিবের সঙ্গে।
- ১.৬ কবি কীসের বাজনা বাজাতে বলেছেন?
উত্তর: ধ্বংসের দব্জা।
- ১.৭ কারাগারের প্রাচীর ভেদ করে কী উড়ুক এটাই কবির ইচ্ছা?
উত্তর: ধ্বংসের পতাকা।
- ১.৮ কবি স্বাধীনতা ঘোষণার ডাক দিয়েছেন কী বাজিয়ে?
উত্তর: গাজনের বাজনা।
- ১.৯ কবিকে কী শুনলে হাসি পায়?
উত্তর: ইংরেজরা ভগবানকে ফাঁসি দিতে চায়।
- ১.১০ কবি দেশের তরুণদের কার মতো প্রলয়দোলা দিয়ে কারাগারগুলো ভেঙে দিতে বলেছেন?
উত্তর: খ্যাপা ভোলানাথের মতো।
- ১.১১ কবি যুবশক্তিকে কী কাঁধে তুলে নিতে ডাক দিয়েছেন?
উত্তর: যুদ্ধের ভেরি।
- ১.১২ দেশের পরিস্থিতি কেমন?
উত্তর: কালবৈশাখী ঝড়ের মতো উত্তাল।
- ১.১৩ কী লাথি মেরে ভাঙতে হবে?
উত্তর: তালা।
- ১.১৪ বন্দিশালাগুলোতে কী জ্বালাতে হবে?
উত্তর: আগুন।
- ১.১৫ কী উপড়ে ফেলতে হবে?
উত্তর: সমস্ত বন্ধন।
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
- ২.১ কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম কোথায়?
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে।
- ২.২ নজরুলের প্রথম কবিতা কোনটি?
উত্তর: ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা 'মুক্তি' প্রকাশিত হয়।
- ২.৩ কোন কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে নজরুল বৃহত্তর পাঠকসমাজে পরিচিত হয়ে ওঠেন?
উত্তর: ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ভারত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতা। এই কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বৃহত্তর পাঠকসমাজে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
- ২.৪ নজরুলের দুটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের নাম লেখো।
উত্তর: অগ্নিবীণা (১৯২২), দোলনচাপা (১৯২৩)।
- ২.৫ নজরুলের সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকার নাম কী?
উত্তর: ধূমকেতু পত্রিকা।
- ২.৬ 'ভাঙার গান' কবিতাটি কোন আন্দোলনের সময় রচিত?
উত্তর: অসহযোগ আন্দোলনের সময়।
- ২.৭ কবি দেশের তরুণদের কী ভেঙে নিশ্চিহ্ন করে দিতে বলেছেন?
উত্তর: কারাগারের লোহার দরজা।
- ২.৮ কারাগারের বেদিতে কী লেগে আছে?
উত্তর: শৃঙ্খলে আবদ্ধ বিপ্লবীদের জমাটরক্ত।
- ২.৯ কবি তরুণ দেশপ্রেমীদের কার সঙ্গে তুলনা করেছেন?
উত্তর: শিবের সঙ্গে।
- ২.১০ কবি কীসের বাজনা বাজাতে বলেছেন?
উত্তর: ধ্বংসের দব্জা।
- ২.১১ কারাগারের প্রাচীর ভেদ করে কী উড়ুক এটাই কবির ইচ্ছা?
উত্তর: ধ্বংসের পতাকা।
- ২.১২ কবি স্বাধীনতা ঘোষণার ডাক দিয়েছেন কী বাজিয়ে?
উত্তর: গাজনের বাজনা।
- ২.১৩ কবিকে কী শুনলে হাসি পায়?
উত্তর: ইংরেজরা ভগবানকে ফাঁসি দিতে চায়।
- ২.১৪ কবি দেশের তরুণদের কার মতো প্রলয়দোলা দিয়ে কারাগারগুলো ভেঙে দিতে বলেছেন?
উত্তর: খ্যাপা ভোলানাথের মতো।
- ২.১৫ কবি যুবশক্তিকে কী কাঁধে তুলে নিতে ডাক দিয়েছেন?
উত্তর: যুদ্ধের ভেরি।
- ২.১৬ দেশের পরিস্থিতি কেমন?
উত্তর: কালবৈশাখী ঝড়ের মতো উত্তাল।
- ২.১৭ কী লাথি মেরে ভাঙতে হবে?
উত্তর: তালা।
- ২.১৮ বন্দিশালাগুলোতে কী জ্বালাতে হবে?
উত্তর: আগুন।
- ২.১৯ কী উপড়ে ফেলতে হবে?
উত্তর: সমস্ত বন্ধন।
- ২.২০ 'ভাঙার গান' কবিতাটির মূল সুর কী?
উত্তর: ব্রিটিশ অপশাসনকে ভেঙে ফেলে স্বাধীনতা অর্জন।
সংক্ষিপ্ত বা ব্যাখ্যাভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর
- ৩.১ ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কবিতায় ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ বলতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক কারাগারকে বোঝানো হয়েছে। এই কারাগার কেবল বিপ্লবীদের আটকে রাখার স্থান নয়, বরং এটি পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল ও বন্দিদশার প্রতীক। কবি এই লোহার কপাট ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন, যা আসলে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জনের প্রতীকী প্রকাশ।
- ৩.২ ‘ওরে ও তরুণ ঈশান! বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!’ – ‘ঈশান’ কে? তাকে ‘প্রলয় বিষাণ’ বাজাতে বলার কারণ কী?
উত্তর: এখানে ‘ঈশান’ বলতে শিবকে বোঝানো হয়েছে, যিনি ধ্বংসের দেবতা। কবি দেশের তরুণদের শিবের সঙ্গে তুলনা করেছেন, কারণ তিনি চান তরুণরা শিবের মতো ধ্বংসের প্রতীক হয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটাক। ‘প্রলয় বিষাণ’ বাজাতে বলার কারণ হলো, এই বিষাণের ধ্বনি যেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে স্বাধীনতার আগমন বার্তা ঘোষণা করে।
- ৩.৩ ‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবি কেন ‘গাজনের বাজনা’ বাজাতে বলেছেন?
উত্তর: ‘গাজনের বাজনা’ হলো শিবের গাজন উৎসবে ব্যবহৃত এক ধরনের বাজনা, যা ধ্বংস ও নতুন সৃষ্টির প্রতীক। কবি এই বাজনা বাজিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার এবং নতুন স্বাধীন ভারত গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেশের তরুণদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছেন, যাতে তারা নির্ভয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
- ৩.৪ ‘ভগবান বুকে এসে ফাঁসিকাঠ’ – মন্তব্যটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: এই পঙক্তিটির মাধ্যমে কবি ব্রিটিশ শাসকদের ঔদ্ধত্য ও মূর্খতাকে ব্যঙ্গ করেছেন। ইংরেজরা মনে করে তারা এতটাই শক্তিশালী যে তারা সত্য ও ন্যায়কে (যা ভগবানের প্রতীক) এমনকি ফাঁসিও দিতে পারে। কিন্তু কবি মনে করিয়ে দেন যে সত্য ও স্বাধীনতা অমর, ঠিক যেমন ভগবান অমর। তাই তাদের এই প্রচেষ্টা হাস্যকর ও ব্যর্থ।
- ৩.৫ ‘ওরে ও পাগলা ভোলা! দে রে দে প্রলয় দোলা!’ – ‘পাগলা ভোলা’ কে? তাকে ‘প্রলয় দোলা’ দিতে বলার কারণ কী?
উত্তর: ‘পাগলা ভোলা’ হলেন শিবের আরেক নাম, যিনি তাঁর প্রলয়ঙ্করী নৃত্যের মাধ্যমে সবকিছু ধ্বংস করে নতুন সৃষ্টির পথ তৈরি করেন। কবি দেশের তরুণদের এই ‘পাগলা ভোলা’র মতো প্রলয় দোলা দিতে বলেছেন, অর্থাৎ তাদের মধ্যে এমন এক ধ্বংসাত্মক শক্তি জাগাতে বলেছেন যা ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দেবে এবং পরাধীনতার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলবে।
বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর
- ৪.১ ‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম পরাধীন ভারতের মুক্তির জন্য যে আহ্বান জানিয়েছেন তা আলোচনা করো।
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘ভাঙার গান’ কবিতায় পরাধীন ভারতের মুক্তির জন্য এক দুর্বার ও বিপ্লবী আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খলকে ভেঙে ফেলার জন্য দেশের তরুণদের প্রতি বিদ্রোহের বার্তা দিয়েছেন। কবি কারাগারের লোহার কপাট ভেঙে ফেলার কথা বলেছেন, যা পরাধীনতার প্রতীক। তিনি তরুণদের ‘ঈশান’ বা শিবের সঙ্গে তুলনা করে প্রলয় বিষাণ বাজাতে বলেছেন, যার মাধ্যমে ধ্বংসের বার্তা ছড়িয়ে পড়বে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে।
নজরুল জোর দিয়ে বলেছেন যে, কেউ মালিক বা রাজা নয়, সবাই সমান ও স্বাধীন। এই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি গাজনের বাজনা বাজিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার ডাক দিয়েছেন। তিনি ব্রিটিশ শাসকদের ঔদ্ধত্যকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন যে তারা ভগবানকে ফাঁসি দিতে চায়, কিন্তু সত্য ও স্বাধীনতাকে কখনও ধ্বংস করা যায় না। কবি তরুণদের ‘পাগলা ভোলা’র মতো প্রলয় দোলা দিয়ে কারাগারগুলো ভেঙে দিতে বলেছেন, যুদ্ধের ভেরি কাঁধে তুলে নিতে বলেছেন এবং মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে দেশের মুক্তির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করার বার্তা দিয়েছেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো উত্তাল বলে বর্ণনা করেছেন এবং তরুণদের সময় নষ্ট না করে কারাগারের ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে, তালা লাথি মেরে ভাঙতে, বন্দিশালাগুলোতে আগুন জ্বালাতে এবং সমস্ত বন্ধন উপড়ে ফেলতে আহ্বান জানিয়েছেন। এই কবিতার মাধ্যমে নজরুল পরাধীনতার বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন, যা দেশের যুবসমাজকে স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।
- ৪.২ ‘ভাঙার গান’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কবিতাটির নামকরণ অত্যন্ত সার্থক ও ব্যঞ্জনাময়। কবিতাটি অসহযোগ আন্দোলনের সময় রচিত হয়েছিল এবং এর মূল সুর হলো ব্রিটিশ অপশাসনকে ভেঙে ফেলে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন।
‘ভাঙার গান’ নামটি একাধিক তাৎপর্য বহন করে:
- পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙা: কবিতাটি ব্রিটিশ শাসনের প্রায় দুশো বছরের পরাধীনতাকে ভেঙে ফেলার আহ্বান জানায়। কারাগারের লোহার কপাট, বন্দিশালা, তালা—এগুলো সবই পরাধীনতার প্রতীক, যা ভেঙে ফেলার কথা কবি বারবার বলেছেন।
- ধ্বংস ও নতুন সৃষ্টির প্রতীক: ‘ভাঙা’ এখানে কেবল ধ্বংস নয়, এটি নতুন সৃষ্টির পূর্বশর্ত। পুরাতন ও জীর্ণ শাসনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে একটি স্বাধীন ও মুক্ত ভারত গড়ার স্বপ্ন এই গানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। শিবের ‘প্রলয় বিষাণ’ বা ‘পাগলা ভোলা’র ‘প্রলয় দোলা’—এগুলো সবই ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন সৃষ্টির ইঙ্গিত দেয়।
- বিদ্রোহ ও বিপ্লবের সুর: সমগ্র কবিতা জুড়েই বিদ্রোহ ও বিপ্লবের এক দুর্বার সুর ধ্বনিত হয়েছে। কবি দেশের তরুণদের নির্ভয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, সমস্ত বন্ধন উপড়ে ফেলতে এবং স্বাধীনতার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন। এই ‘ভাঙা’ আসলে আপোষহীন সংগ্রামের প্রতীক।
- মুক্তির আহ্বান: ব্রিটিশ শাসনে সমগ্র ভারতবর্ষই যেন এক বিশাল বন্দিশালায় পরিণত হয়েছিল। এই বন্দিদশা থেকে দেশবাসীকে মুক্ত হওয়ার জন্য সশস্ত্র বিপ্লব ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ভেঙে ফেলার আহ্বানই এই গানের মূল বিষয়।
সুতরাং, কবিতাটির বিষয়বস্তু, কবির উদ্দেশ্য এবং এর বিপ্লবী সুর—সবকিছুই ‘ভাঙার গান’ নামকরণের যথার্থতা প্রমাণ করে। এটি কেবল একটি গান নয়, এটি পরাধীনতার বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক ভাঙনের আহ্বান, যা স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করবে।
- ৪.৩ ‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবি কেন ব্রিটিশ শাসকদের প্রতি ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপ প্রকাশ করেছেন? আলোচনা করো।
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘ভাঙার গান’ কবিতায় ব্রিটিশ শাসকদের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপ প্রকাশ করেছেন। এর প্রধান কারণগুলি নিম্নরূপ:
- ঔদ্ধত্য ও মূর্খতা: ব্রিটিশ শাসকরা নিজেদেরকে এতটাই সর্বশক্তিমান মনে করত যে তারা মনে করত সত্য ও ন্যায়কেও তারা দমন করতে পারে। কবি এই ঔদ্ধত্যকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, “ভগবান বুকে এসে ফাঁসিকাঠ।” এটি তাদের মূর্খতার প্রতীক, কারণ সত্য এবং স্বাধীনতাকে কখনও ফাঁসি দেওয়া যায় না।
- মিথ্যাচার ও ভণ্ডামি: ব্রিটিশরা নিজেদেরকে সভ্য ও ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে দাবি করলেও বাস্তবে তারা ছিল অত্যাচারী ও শোষক। কবি তাদের এই মিথ্যাচারকে বিদ্রূপ করেছেন এবং তাদের প্রকৃত রূপ উন্মোচন করেছেন।
- ভয়হীনতা ও বিদ্রোহের বার্তা: ব্রিটিশদের প্রতি ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের মাধ্যমে কবি দেশের তরুণদের মধ্যে ভয়হীনতা ও বিদ্রোহের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে ব্রিটিশরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তারা অমর সত্যকে দমন করতে পারবে না এবং তাদের শাসন একদিন ভেঙে পড়বেই।
- জনগণকে জাগিয়ে তোলা: কবির ব্যঙ্গাত্মক ভাষা জনগণের মনে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভ তৈরি করতে সাহায্য করেছে। এর মাধ্যমে তিনি জনগণকে পরাধীনতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
নজরুল এই কবিতায় ব্রিটিশ শাসনকে একটি জীর্ণ ও পচা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা ভেঙে ফেলা অপরিহার্য। তাঁর ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপ কেবল কথার কথা ছিল না, বরং তা ছিল বিপ্লবের আগুন জ্বালানোর একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে সহায়ক হয়েছিল।
অন্যান্য বাংলা অধ্যায় (নবম শ্রেণী)
বাংলা Resources
Complete Bengali Solutions কিনুন
অফলাইন অধ্যয়নের জন্য সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তর PDF ফরম্যাটে পান