Advertisement
Advertisement

নব নব সৃষ্টি: সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি বিশদ আলোচনা

লেখক পরিচিতি: সৈয়দ মুজতবা আলী

জন্ম: ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সিলেটের করিমগঞ্জে তাঁর জন্ম হয়। বাবার নাম সেকেন্দার আলী এবং মা আমতুন মান্নান খাতুন। বাবার বদলি চাকরি নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা ঘটে। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি শান্তিনিকেতনে আসেন এবং সেখান থেকে সংস্কৃত, ইংরেজি, হিন্দি, গুজরাটি, আরবি, ফরাসি প্রভৃতি ভাষা তিনি শেখেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতন থেকে তিনি বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন: তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা দিয়ে। তারপর আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার অধ্যাপক নিযুক্ত হয়ে কাবুলে যান। কাবুল থেকে হোমবোল্ভ বৃদ্ধি পেয়ে তিনি গবেষণার জন্য জার্মানি যান। তিনি ভাষা গবেষণার ডিগ্রি লাভ করে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে আবার তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন।

সাহিত্য জীবন: শান্তিনিকেতনে পড়তে পড়তে তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতি, সত্যযুগ প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশ হত। বহু দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ কাহিনী, ছোট গল্প, উপন্যাস দ্বারা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল- ভ্রমণ কাহিনী- 'দেশে-বিদেশে', রম্য রচনা-'পঞ্চতন্ত্র', উপন্যাস- 'শবনম', ছোটগল্প- 'চাচাকাহিনী', প্রবন্ধ- 'চতুরঙ্গ', প্রভৃতি।

সম্মান ও স্বীকৃতি: তাঁর সাহিত্যের জন্য তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। যেমন- ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে নরসিংহ দাস পুরস্কার, ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর 'একুশে পদক' এ ভূষিত করেছেন।

মৃত্যু: ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে এই মহান সাহিত্যিকের মৃত্যু ঘটে।

বিষয়সংক্ষেপ

প্রাচীন যুগের অধিকাংশ ভাষাকে লেখক আত্মনির্ভরশীল এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা বলেছেন। হিব্রু, গ্রীক, আবেস্তা, সংস্কৃত এবং কিছুটা পরবর্তী যুগের আরবিও নতুন ভাষার প্রয়োজন হলে নিজ ভান্ডারে প্রথমে শব্দের খোঁজ করেছে। এই সমস্ত ভাষা খুব সামান্যই বিদেশী ভাষা ব্যবহার করেছে, এই ভাষা গুলি স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিয়ে লেখক কোন আপত্তি প্রকাশ করেননি। এই বিচারে লেখক বর্তমান যুগের বাংলা এবং ইংরেজিকে অন্য ভাষার উপর নির্ভরশীল বলেছেন। কারণ বাংলা এবং ইংরেজি প্রয়োজন ছাড়াও বিদেশি শব্দ ব্যবহার করে। পাঠান-মোগল যুগে আরবি, ফারসি শব্দের খুব বেশি প্রচলনের ফলে এই দুই ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় প্রচুর শব্দ প্রবেশ করেছে।

লেখক স্পষ্ট ভাবে বলেছেন যে বিদেশী শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করবেই সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আলু, কফির বা বিলেতি ওষুধের ব্যবহার যেমন-রোজ বাড়ছে তেমনি বাংলা ভাষাতে বিদেশি শব্দ থেকে যাবে এবং আরো নতুন শব্দের প্রবেশ ঘটবে।

হিন্দি ভাষার তরুণ সাহিত্যিকরা হিন্দি ভাষা থেকে আরবি, ফারসি, ইংরেজি ভাষার ব্যবহার বন্ধ করার প্রচেষ্টা শুরু করেছেন। তাঁদের এই চেষ্টার ফলাফল ভালো না মন্দ হবে, সে কথা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় অনায়াসেই বিদেশি শব্দের ব্যবহার করেছেন। এমনকি হিন্দি ভাষার বঙ্কিমচন্দ্র হিসেবে পরিচিত মুন্সি প্রেম চন্দও হিন্দি ভাষার আরবি ফারসি শব্দের ব্যবহার করেছেন। শংকর দর্শনের ভাষা সংস্কৃত ভাষা হবে। আবার মোগলাই রেস্তোরাঁর ভাষা হুতুম প্যাঁচার নকশায় ব্যবহৃত ভাষার মতোই হবে। বসুমতি পত্রিকার সম্পাদকীয়তাতে গম্ভীর্য থাকলেও বাঁকা চোখের ভাষাতে রয়েছে চটুলতা।

বাংলা ভাষায় যেসব বিদেশি শব্দ প্রবেশ করেছে তাদের মধ্যে আরবি ফারসি এবং ইংরেজি প্রধান। স্কুল-কলেজ থেকে সংস্কৃত চর্চা বন্ধ করা উচিত নয় কারণ বাংলা ভাষার বর্তমানেও সংস্কৃত ভাষার প্রয়োজন আছে। ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রেও সংস্কৃতের মতই একই কথা প্রযোজ্য কারণ দর্শন, নন্দন শাস্ত্র এবং বিজ্ঞান বিষয়ক সাহিত্যচর্চাতে ইংরেজি ভাষার বিকল্প নেই কারণ রেলের ইঞ্জিন চালাতে হয় কি করে তা জানার জন্য ইংরেজি ভাষারই বেশি প্রয়োজন। আরবি এবং ফারসি ভাষা দারুন ভাবে বাংলায় প্রবেশ আর করবে না কারণ তরুণ বাঙালিরা এই দুই ভাষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। তবে যে সব আরবি ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় ইতিমধ্যে ঢুকে গেছে সেগুলি দীর্ঘদিন চালু থাকবে।

প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় মাদ্রাসাগুলিতে আরবি ভাষা পড়ানো হলেও ভারতীয় আর্যরা ফরাসি ভাষার প্রতি অনেক বেশি আকৃষ্ট হন। ফরাসি ভাষার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে উর্দু এবং কাশ্মীরি ভাষার জন্ম হয়। উর্দু কবি ইকবাল উর্দু ভাষাকে ফরাসির প্রভাব থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন।

বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য পদাবলী কীর্তন। এই কাব্যের শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীমতি রাধার চরিত্রে খাঁটি বাঙালিয়ানা ফুটে উঠেছে। ভাটিয়ালির নায়িকা, বাউলের ভক্ত, মুর্শিদি গানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাঙালি তার ধর্ম, রাজনীতি, সাহিত্য-সর্বত্রই সত্য-শিব- সুন্দরের আরাধনা করেছেন এবং সেই আরাধনায় কেউ বাধা দিলে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এই বিদ্রোহী মনোভাব বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় জাতির ক্ষেত্রেই বর্তমান।

নামকরণ

সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে নামকরণের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। নামকরণ নানান ভাবে হতে পারে। যেমন- বিষয়কেন্দ্রিক, চরিত্রপ্রদান, ব্যঞ্জনধর্মী ইত্যাদি। লেখক তার নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধে বলেছেন, কিছু ভাষা আছে যেমন সংস্কৃত, হিব্রু, গ্রীক, আবেস্তা এমনকি আরবি ইত্যাদি প্রাচীন ভাষাগুলি অনেকটাই আত্মনির্ভরশীল। আবার বাংলা, ইংরেজির মত ভাষাগুলি অন্য ভাষা থেকেও শব্দ নেয়। এই শব্দগুলি স্থায়ীভাবে ভাষায় থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর- সকলেই অন্য ভাষা থেকে শব্দ নিয়ে নিজেদের সাহিত্যে ব্যবহার করেছেন। এইসব শব্দও বাংলা ভাষায় কিছুদিন টিকে থাকবে। এখন আরবি থেকে ফরাসির গ্রহণযোগ্যতা বেশি। উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যে ফরাসি ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ইকবালের মতো কেউ কেউ অবশ্য উর্দুকে ফরাসির প্রভাব মুক্ত করতে চেষ্টা করেছেন। আবার পদাবলী কীর্তন- বাঙালি হিন্দুই হোক অথবা মুসলমান- তারা সব সময় স্বাধীনভাবে চলতে চায়- এই বিদ্রোহী সত্তা তাদের মধ্যে সব সময় কাজ করতে থাকে। সব মিলিয়ে শব্দ ও ভাষাধার নেওয়া বা বর্জন করা এই দুই বিপরীতমুখী লড়ায়ে সাহিত্য গড়ে ওঠে। তাই 'নব নব সৃষ্টি' নামকরণটি সার্থক হয়ে উঠেছে।

নব নব সৃষ্টি গল্পের ছবি

নব নব সৃষ্টি: সৈয়দ মুজতবা আলী

নব নব সৃষ্টি (প্রবন্ধ) সৈয়দ মুজতবা আলী – নবম শ্রেণীর বাংলা প্রশ্ন ও উত্তর:

MCQ

  1. ১.১ বাংলা ভাষায় যে বিদেশি ভাষাটি তুলনামূলকভাবে কম ঢুকেছে তা হল —

    (A) ফরাসি

    (B) আরবী

    (C) ফারসি

    (D) সংস্কৃত

  2. ১.২ ইরানি আর্য সাহিত্য কোনটি?

    (A) ফরাসি

    (B) আরবী

    (C) ফারসি

    (D) বাংলা

  3. ১.৩ বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি কোনটি?

    (A) পদাবলী কীর্তন

    (B) চর্যাপদ

    (C) বাউল

    (D) অনুবাদ

  4. ১.৪ হিন্দি পদ্যের উপর প্রভাব বেশি পড়েছিল যে ভাষার টা হলো —

    (A) সংস্কৃত

    (B) আরবী

    (C) ফারসি

    (D) উর্দু

  5. ১.৫ ভারতীয় আর্যগণ যে ভাষার সৌন্দর্যমুক্ত হয়েছিলেন —

    (A) উর্দু

    (B) ফারসি

    (C) আরবী

    (D) তেলেগু

  6. ১.৬ প্রাচীন যুগের সব ভাষাই –

    (A) আত্মনির্ভরশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ

    (B) পরনির্ভরশীল

    (C) বর্তমানে অপ্রচলিত

    (D) বহুল প্রচলিত

  7. ১.৭ রচনার ভাষা নির্ভর করে –

    (A) তার লেখকের মানসিকতার উপর

    (B) তার বিষয়বস্তুর উপর

    (C) রচনার সময়কালের উপর

    (D) পাঠকের চাহিদার উপর

  8. ১.৮ বাঙালির চরিত্রে বিদ্রোহ –

    (A) বিদ্যমান নয়

    (B) অল্প পরিমাণে বিদ্যমান

    (C) বিদ্যমান

    (D) বহুলরূপে বিদ্যমান

  9. ১.৯ প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি তার-

    (A) মঙ্গলকাব্যে

    (B) চর্যাগানে

    (C) পদাবলী কীর্তনে

    (D) বাউল গানে

  10. ১.১০ উর্দুকে ফার্সির অনুকরণ থেকে কিঞ্চিৎ নিষ্কৃতি দিতে সক্ষম হয়েছিলেন-

    (A) কবি ইকবাল

    (B) নিদা ফজিল

    (C) আলি সরদার জাফরি

    (D) মির্জা গালিব

  11. ১.১১ এদের মধ্যে প্রাচীন যুগের ভাষা নয় –

    (A) গ্রিক

    (B) এসপেরান্তো

    (C) আবেস্তা

    (D) হিব্রু

  12. ১.১২ ‘নব নব সৃষ্টি’ গল্পের রচয়িতা কে?

    (A) সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    (B) সৈয়দ মুজতবা আলী

    (C) সৈয়দ আলী হোসেন

    (D) সৈয়দ হোসেন শাহ

  13. ১.১৩ যে ভাষা আত্মনির্ভরশীল নয় তা হল —

    (A) গ্রীক

    (B) আবেস্তা

    (C) ইংরেজি

    (D) হিব্রু

  14. ১.১৪ প্রাচীন যুগের ভাষা কোনটি?

    (A) ফারসি

    (B) হিব্রু

    (C) ইংরেজি

    (D) আবেস্তা

  15. ১.১৫ হিন্দির বঙ্কিম হলেন —

    (A) প্রেমচাঁদ

    (B) গুলজার

    (C) ইকবাল

    (D) নিরীলা

  16. ১.১৬ উর্দু ভাষার একজন বিখ্যাত কবি হলেন —

    (A) মুর্শিদিয়া

    (B) প্রেমচাঁদ

    (C) নজরুল ইসলাম

    (D) ইকবাল

  17. ১.১৭ “সংস্কৃত শব্দ বাংলায় ঢুকেছে”, কারণ –

    (A) সংস্কৃত চর্চা এদেশে ছিল বলে

    (B) সংস্কৃত বাংলা ভাষার জননী বলে

    (C) বাংলায় এখনও বহু সংস্কৃত শব্দের প্রয়োগ রয়েছে,

    (D) সংস্কৃত ভাষা জানা আবশ্যক বলে

  18. ১.১৮ ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধাংশটির নাম –

    (A) ‘চতুরঙ্গ’

    (B) ‘বত্রিশ সিংহাসন’

    (C) ‘পঞ্চতঞ্চ’

    (D) ‘চাচা কাহিনী’

  19. ১.১৯ ‘আবেস্তা’ ভাষাটি ব্যবহার করত-

    (A) গ্রিকরা

    (B) ইহুদিরা

    (C) আরবদেশীয়রা

    (D) জরাথুস্ট্রিয়রা

  20. ১.২০ ‘আতর’ একটি –

    (A) তামিল

    (B) ফারসি

    (C) আরবি

    (D) ইংরেজি – শব্দ

Advertisement

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

  1. ২.১ “সেগুলাে নিয়ে অত্যধিক দুশ্চিন্তা করার কোনাে কারণ নেই।”— কোন্ বিষয়ে দুশ্চিন্তা করা নিষ্প্রয়ােজন?

    উত্তর: পাের্তুগিজ, ফরাসি, স্প্যানিশ ইত্যাদি শব্দ বাংলা ভাষায় এত কম এসেছে যে তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোনাে কারণ নেই বলে লেখক মনে করেছেন।

  2. ২.২ “সে ভাষার শব্দ বাংলাতে ঢুকবেই।”—কোন্ ভাষার?

    উত্তর: বাংলা ছাড়া অন্য যে-কোনাে ভাষার চর্চা আমরা করি না কেন সে ভাষার শব্দ বাংলাতে ঢুকবেই।

  3. ২.৩ লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী বিস্তর সংস্কৃত শব্দ বাংলায় প্রবেশের কারণ কী বলেছেন?

    উত্তর: প্রাচীন যুগ থেকেই বাংলাদেশে সংস্কৃত ভাষার ব্যাপক চর্চা ছিল। ফলে বিস্তর সংস্কৃত শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে।

  4. ২.৪ কোন্ বিশেষ বিশেষ বিদ্যাচর্চায় ইংরেজি অবশ্যই প্রয়ােজন বলে লেখক মনে করেন?

    উত্তর: দর্শন, নন্দনশা, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা এবং বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ইংরেজি অবশ্যই প্রয়ােজন বলে লেখক মনে করেন।

  5. ২.৫ “এই দুই ভাষা থেকে ব্যাপকভাবে আর নূতন শব্দ বাংলাতে ঢুকবে।” — কোন্ দুই ভাষার কথা এখানে বলা হয়েছে?

    উত্তর: ‘নব নব সৃষ্টি’ রচনাংশে সৈয়দ মুজতবা আলী দুই ভাষা বলতে আরবি এবং ফারসি ভাষার কথা বলেছেন।

  6. ২.৬ হিন্দি গদ্যের ওপর কোন্ ভাষার প্রভাব পড়ার কথা বলেছেন লেখক?

    উত্তর: হিন্দি গদ্যের ওপর ফারসি ভাষার প্রভাব পড়ার কথা বলেছেন।

  7. ২.৭ লেখক ভারতীয় আর্যরা কোন্ ভাষার সৌন্দর্যে বেশি অভিভূত হয়েছিল?

    উত্তর: ভারতীয় আর্যরা ফারসি ভাষার সৌন্দর্যে বেশি অভিভূত হয়েছিল।

  8. ২.৮ “ভারতবর্ষীয় এ তিন ভাষা ফার্সির মতাে নব নব সৃষ্টি দিয়ে ঐশ্বর্যশালী সাহিত্যসৃষ্টি করতে পারল না।” — ভারতবর্ষের এ তিন ভাষা কী কী?

    উত্তর: ভারতবর্ষীয় এ তিন ভাষা’ বলতে সিদ্ধি, উর্দু এবং কাশ্মীরি ভাষাকে বােঝানাে হয়েছে।

  9. ২.৯ ‘নব নব সৃষ্টি’ রচনাংশে লেখক কোন্ উর্দু কবির কথা উল্লেখ করেছেন?

    উত্তর: ‘নব নব সৃষ্টি’ রচনাংশে লেখক উর্দু কবি ইকবালের কথা উল্লেখ করেছেন।

  10. ২.১০ সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি কোনটি?

    উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন যে, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি হল পদাবলি কীর্তন।

  11. ২.১১ বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি কী?

    উত্তর: বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি পদাবলী কীর্তন।

  12. ২.১২ “ধর্ম বদলালেই জাতির চরিত্র বদলায় না।” – কেন এরূপ বলেছেন লেখক?

    উত্তর: কারণ বাংলা ভাষার বিবর্তন কেবল মাত্র বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বাঙালি মুসলমানরাও এই কর্মে সমান তৎপর তাই লেখক বলেছেন, “ধর্ম বদলালেই জাতির চরিত্র বদলায় না”।

  13. ২.১৩ হিন্দি পদ্যের ওপর কোন্‌ ভাষার প্রভাব পড়েছে?

    উত্তর: হিন্দি পদ্যের ওপর আরবি – ফার্সি ভাষার প্রভাব পড়েছে।

  14. ২.১৪ ‘নব নব সৃষ্টি’ রচনাংশে কোন্ কোন্ ভাষাকে লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন ‘আত্মনির্ভরশীল’?

    উত্তর: ‘নব নব সৃষ্টি’ রচনাংশে লেখক প্রাচীন যুগের হিব্রু, গ্রিক, আবেস্তা, সংস্কৃত এবং আরবি ভাষাকে ‘আত্মনির্ভরশীল’ বলেছেন।

  15. ২.১৫ লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে বর্তমান যুগের কোন্ কোন্ ভাষা আত্মনির্ভরশীল নয়?

    উত্তর: লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে বর্তমান যুগের ইংরেজি এবং বাংলা ভাষা আত্মনির্ভরশীল নয়।

  16. ২.১৬ পাঠান-মােগল যুগে আরবি ও ফারসি থেকে শব্দ গ্রহণ করতে হয়েছিল কেন?

    উত্তর: পাঠান-মােগল যুগে আইন-আদালত, খাজনাখারিজ নতুন করে দেখা দেওয়ায় আরবি-ফারসি ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করতে হয়।

  17. ২.১৭ নব নব সৃষ্টি’ রচলাংশে লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী কোন্ প্রশ্নকে অবান্তর বলেছেন?

    উত্তর: ভাষায় বিদেশি শব্দগ্রহণ ভালাে না মন্দ — এই প্রশ্নকে লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী অবান্তর বলেছেন।

  18. ২.১৮ “সে সম্বন্ধেও কারও কোনাে সন্দেহ নেই।” — কোন্ বিষয়ে সন্দেহ নেই?

    উত্তর: শিক্ষার মাধ্যমরূপে ইংরেজির বদলে বাংলা গ্রহণ করলে প্রচুর পরিমাণে ইউরােপীয় শব্দ বাংলায় প্রবেশ করবে। এ বিষয়ে কারও কোনাে সন্দেহ নেই।

  19. ২.১৯ ‘নব নব সৃষ্টি’ রচনাংশে লেখক রান্নাঘর থেকে কী কী তাড়ানাে মুশকিল বলেছেন?

    উত্তর: ‘নব নব সৃষ্টি’ রচনাংশে রান্নাঘর থেকে আলুকপি এ জাতীয় বিদেশি সবজি তাড়ানাে মুশকিল বলেছেন লেখক।

  20. ২.২০ “বহু সাহিত্যিক উঠে পড়ে লেগেছেন”—লেখক কোন্ ভাষার সাহিত্যিকদের কথা বলেছেন?

    উত্তর: লেখক হিন্দি ভাষার সাহিত্যিকদের কথা বলেছেন।

  21. ২.২১ নজরুল ইসলাম বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন তার কী কী উদাহরণ দিয়েছেন সৈয়দ মুজতবা আলী?

    উত্তর: নজরুল ইসলাম ‘ইনকিলাব’ এবং ‘শহিদ’ প্রভৃতি আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় ব্যবহার করেছেন।

  22. ২.২২ ‘আলাল’ ও ‘হুতোম’-এর ভাষা —‘আলাল’ ও ‘হুতোম’ কী?

    উত্তর: ‘আলাল’ হল আলালের ঘরের দুলাল, লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র। ‘হুতোম’ হল হুতােম প্যাঁচার নকশা, লেখক কালীপ্রসন্ন সিংহ।

  23. ২.২৩ হিন্দি ভাষাসাহিত্যের বঙ্কিম কাকে বলা হয়?

    উত্তর: হিন্দি ভাষাসাহিত্যের বঙ্কিম বলা হয় বিখ্যাত সাহিত্যিক মুন্সী প্রেমচাঁদকে।

  24. ২.২৪ “এখানে আর একটি কথা বলে রাখা ভালাে।” — কী কথা বলেছেন লেখক?

    উত্তর: রচনার ভাষা তার বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করে, এ কথা বলেছেন লেখক।

  25. ২.২৫ বাংলায় যেসব বিদেশি শব্দ ঢুকেছে তার মধ্যে কোন্ কোন্ ভাষা প্রধান বলেছেন লেখক?

    উত্তর: বাংলায় যেসব বিদেশি শব্দ প্রবেশ করেছে তার মধ্যে আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি অন্যতম।

  26. ২.২৬ উর্দু সাহিত্যেরমূল সুর কোন্‌ ভাষার সঙ্গে বাঁধা?

    উত্তর: উর্দু সাহিত্যেরমূল সুর ফারসি ভাষার সঙ্গে বাঁধা।

  27. ২.২৭ স্কুল-কলেজ থেকে আমরা সংস্কৃতচর্চা উঠিয়ে দিতে চাই না কেন?

    উত্তর: স্কুল-কলেজ থেকে আমরা সংস্কৃতচর্চা উঠিয়ে দিতে চাই না এর প্রধান কারণ বাংলাতে এখনও আমাদের বহু সংস্কৃত শব্দের প্রয়োজন।

সংক্ষিপ্ত বা ব্যাখ্যাভিত্তিক

  1. ৩.১ “সংস্কৃত চর্চা উঠিয়ে দিলে আমরা অন্যতম প্রধান খাদ্য থেকে বঞ্চিত হব।” — লেখক এ কথা বলেছেন কেন?

    উত্তর: নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধের লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী মনে করেন আমরা যে ভাষার চর্চা বেশি করি তার শব্দ আমাদের বাংলাতে ঢোকে বেশি। সংস্কৃত বেশি চর্চার ফলে বাংলায় বিস্তর সংস্কৃত এককালে ঢুকেছে। স্কুল-কলেজের পাঠ্য বিষয় থেকে সংস্কৃত তুলে না দেওয়াই শ্রেয়। কারণ বাংলা ভাষাতে এখনও সংস্কৃত শব্দের প্রয়োজনীয়তা আছে। লেখক সেজন্য বলেছেন যে, সংস্কৃত চর্চা উঠিয়ে দেওয়ার অর্থ হল বাঙালির অন্যতম খাদ্য থেকে বঞ্চিত হওয়া।

  2. ৩.২ “বাঙালির চরিত্রে বিদ্রোহ বিদ্যমান।” – এ প্রসঙ্গে তোমার মত উপযুক্ত উদাহরণসহ প্রতিষ্ঠা করো।

    উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, বাঙালি জাতির চরিত্রে বিদ্রোহ বর্তমান। বাঙালিরা যখন রাজনীতি, ধর্ম বা সাহিত্যে কোন নতুনত্বের স্বাদ পেয়েছে, সংকীর্ণতার ভুলে তা গ্রহণ করেছে, কিন্তু আবার যদি প্রাচীনত্বের দোহাই দিয়ে কিছু চাপিয়ে দিতে চেয়েছে তখন মাথা তুলে তার প্রতিবাদ করেছে। আবার যখন সেই বিদ্রোহ উশৃঙ্খলতায় পরিণত হতে চেয়েছে, তখন তার বিরুদ্ধে আবার বিদ্রোহ করেছে। প্রাবন্ধিকের এই মতামতের জ্বলন্ত সাক্ষী একাত্তরের ভাষা আন্দোলন, পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের উপর জোর করে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চাইলে বাঙালিরা একজোট হয়ে আন্দোলন শুরু করে এবং এর ফলস্বরূপ বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়।

  3. ৩.৩ ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যে বিদেশি শব্দ ব্যবহারের যে সকল দৃষ্টান্ত লক্ষ করা যায় তা উল্লেখ করো।

    উত্তর: ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে, প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা ভাষায় বিভিন্ন বিদেশী শব্দের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলা ভাষায় প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন বিদেশী শব্দ নেওয়া হয়েছে, যেমন পাঠান – মোগল যুগে তাদের ব্যবহৃত ভাষা আরবি ও ফার্সি থেকে বিভিন্ন শব্দ যেমন আইন – আদালত, খাজনা – খারিজ শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে আব্রু, ইজ্জত, শহিদ, ইনকিলাবের মত বিদেশী শব্দ স্থান পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের লেখায়। বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁর ‘সাধু’ রচনায় বিদেশী শব্দ ব্যবহার না করলেও, তাঁর রচিত বেনামী রচনায় আরবি এবং ফার্সি শব্দের ব্যাপক ব্যবহার করেছেন। এমনকি অতিশয় নিষ্ঠাবান হরপ্রসাদ-ও বাংলা ভাষায় আরবি এবং ফার্সি শব্দের ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন না।

  4. ৩.৪ ‘বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি তার পদাবলি কীর্তনে।’ – এই মন্তব্যের সপক্ষে লেখকের বক্তব্য লেখো।

    উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী, তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি পদাবলী কীর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, পদাবলী কীর্তনের প্রাণ ও দেহ উভয়ই খাঁটি বাঙালি। সংস্কৃত সাহিত্য মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র ‘শ্রীকৃষ্ণ’ পদাবলীতে ‘কানু’ রূপে বর্ণিত হয়েছেন। আবার শ্রীরাধাও যে খাঁটি বাঙালি একটি মেয়ে তাও সহজেই অনুমেয়। এমনকি বাংলার ভাটিয়ালি গানও এর অন্তর্ভুক্ত।

  5. ৩.৫ “বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা আত্মনির্ভরশীল নয়।” — ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক কীভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন?

    উত্তর: প্রাচীন যুগের সংস্কৃত ভাষা তো বটেই, তা ছাড়া হিব্রু, গ্রিক, আবেস্তা প্রভৃতি সব ভাষাই ছিল আত্মনির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা ভাষা আত্মনির্ভরশীল নয়। কারণ, প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ গৃহীত হয়েছে ও হচ্ছে। পাঠান-মোগল শাসন যুগে আইন-আদালত, খাজনাখারিজ ব্যাপারে নতুন নতুন শব্দের জন্য আরবি ও ফারসি ভাষা থেকে শব্দ নিতে হয়েছিল। তার পরবর্তী ইংরেজ শাসন যুগে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে নিতে হয়েছে কিংবা হচ্ছে অন্যান্য ভাষা থেকে শব্দ। ইংরেজির মাধ্যমে প্রচুর ইউরোপীয় শব্দ আমাদের বাংলা ভাষায় ঢুকেছে। কাজেই বর্তমান বাংলা ভাষা আত্মনির্ভরশীল নয়।

  6. ৩.৬ “সংস্কৃতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা বলাতে কারও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।” ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ শব্দের অর্থ লেখো। সংস্কৃত কেন স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার মর্যাদা পেতে পারে?

    উত্তর: ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ কথার অর্থ যা নিজ দ্বারা সম্পূর্ণ বা যার নিজ ভিন্ন অন্য কারুর সাহায্যের প্রয়োজন নেই। প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধাংশে সংস্কৃত ভাষাকে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ কোনো নূতন চিন্তা, অনুভুতি কিংবা বস্তুর জন্য নবীন শব্দের প্রয়োজন হলে সংস্কৃত ভাষা অন্য কোন ভাষা থেকে শব্দ ধার না করে নিজ শব্দ ভাণ্ডার থেকে নতুন শব্দের অনুসন্ধান করে। কোনো ধাতু বা শব্দের সামান্য অদল বদল করে বা পুরানো ধাতু দিয়ে নবীন শব্দের সৃষ্টি করে। সংস্কৃত ভাষাতেও বিদেশী শব্দের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু তা এতই যতসামান্য যে তা সহজেই উপেক্ষা করা যায়। তাই লেখকের মতে সংস্কৃত ভাষা স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার মর্যাদা পেতে পারে।

  7. ৩.৭ “নূতন আমদানিও বন্ধ করা যাবে না।” – ‘নূতন আমদানি’র কোন্‌ কোন্‌ প্রসঙ্গ এক্ষেত্রে এনেছেন লেখক? ভাষার ক্ষেত্রে ‘নূতন আমদানি’ বন্ধ করা যাবে না কেন?

    উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা ভাষায় বিদেশী ভাষায় ব্যবহার প্রসঙ্গে ‘নূতন আমদানি বন্ধ করা যাবে না’ উক্তিটি করেছেন। তাঁর মতে প্রাচীন যুগের সকল ভাষাই স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রাচীন ভাষার ক্ষেত্রে নূতন কোনো চিন্তা, অনুভুতি কিংবা বস্তুর জন্য নবীন শব্দের প্রয়োজন হলে তা নিজ শব্দভাণ্ডারের পরিবর্তিত রূপ হিসাবে ব্যবহার হত। কিন্তু বাংলা বা ইংরেজি ভাষার মত অপেক্ষাকৃত নতুন ভাষার ক্ষেত্রে বিদেশী শব্দের প্রভাব বা ‘নূতন আমদানি’ যথেষ্ট বেশি। ইংরেজি বা বাংলার মত নবীন ভাষার ক্ষেত্রে বিদেশী শব্দের প্রভাব বা প্রাবন্ধিকের ভাষায় ‘নূতন আমদানি’ বন্ধ করা অসম্ভব। কারণ প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে আমরা বিদেশী ভাষা থেকে শব্দবন্ধ আমাদের নিজেদের ভাষায় নিয়ে এসেছি, যেমন আইন – আদালত এই বহুল প্রচলিত শব্দগুলি আরবি শব্দভান্ডার থেকে এসেছে, তেমনই আতর (সুগন্ধি) শব্দটি এসেছে ফার্সি শব্দভাণ্ডার থেকে। তাই এই ধরণের শব্দগুলি আমাদের ভাষার মধ্যে মিশে গেছে, যা আজ আলাদা করা একপ্রকার অসম্ভব। আবার শিক্ষার মাধ্যমরূপে ইংরেজিকে বর্জন করে বাংলাকে গ্রহণ করার পরে বাংলা ভাষায় আরো বেশি ইউরোপীয় শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যাবে। অপরদিকে আগামীদিনে প্রয়োজনের তাদিগে বিদেশী দ্রব্যের ব্যবহারের মাধ্যে দিয়ে (যেমন বিদেশী ওষুধ) নতুন শব্দ ‘আমদানী’ হবে।

বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী

  1. ৪.১ বাংলা ভাষায় আগন্তুক শব্দ কোনগুলি? প্রসঙ্গক্রমে সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা নিয়ে লেখকের বক্তব্য স্পষ্ট করাে।

    উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ রচলাংশে জানিয়েছেন যে বাংলায় যেসব বিদেশি শব্দ প্রবেশ করেছে সেগুলির মধ্যে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষার শব্দই প্রধান। একসময়ে ভারতবর্ষ তথা বাংলাদেশে সংস্কৃত ভাষার ব্যাপক চর্চা ছিল। কারণ সংস্কৃতই ছিল আদি ও মূল ভাষা। এখনও স্কুল কলেজে সংস্কৃতচর্চা হয়। সংস্কৃত থেকে উৎপন্ন হওয়ার ফলে বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ভাষার প্রভাব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সংস্কৃত শব্দ এখনও সামান্য হলেও বাংলা ভাষায় প্রবেশ করছে। সংস্কৃত ভাষাকে বাংলার মাতৃসম ভাষাই বলা হয়, তাই সংস্কৃতচর্চা বন্ধ করে দিলে বাংলা ভাষা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। তাই লেখক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আমরা অন্যতম প্রধান খাদ্য থেকে বঞ্চিত হবাে।” আধুনিক শিক্ষার ধারায় দর্শনশাস্ত্র, নন্দনশা, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা এবং বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার বিকল্প নেই। উদাহরণ হিসেবে লেখক বলেছেন যে রেলের ইঞ্জিন কী করে চালাতে হয়, সে বিষয়ে বাংলায় কোনাে বই নেই। ফলে এই বিষয়টা বুঝতে হলে বাঙালিকে ইংরেজি ভাষারই আশ্রয় নিতে হয়। সুতরাং ইংরেজি চর্চা বন্ধ করার সময় এখনও আসেনি।”— এ কথা বলাই যায়।

  2. ৪.২ ফল যদি ভাল হয় তখন তারা না হয় চেষ্টা করে দেখবেন। কী চেষ্টা করে দেখার কথা এখানে বলা হয়েছে? এবিষয়ে বাঙালি সাহিত্যিকদের ভূমিকা কী ছিল?

    উত্তর: সমালোচকদের মতে, একটা ভাষা তখনই আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে যখন নতুন শব্দের প্রয়োজনে বিদেশি শব্দের মুখাপেক্ষী না থেকে নিজস্ব শব্দভাণ্ডার থেকেই শব্দ খুঁজে এনে প্রয়োগ করে। হিন্দি উপস্থিত সেই চেষ্টাটা শুরু করেছে। হিন্দি সাহিত্যিকেরা হিন্দি থেকে আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি শব্দ বর্জন করতে শুরু করেছে। এখানে এই প্রচেষ্টার কথাই বলা হয়েছে। এ বিষয়ে বাঙালি সাহিত্যিকদের ধারণা ছিল বেশ স্পষ্ট। বাংলায় সংস্কৃত অন্যান্য প্রাচীন ভাষার মতো বা শব্দ সৃষ্টির ক্ষমতা ছিল না। তাই নতুন শব্দ বা বিষয়-ভাবনার অভিনব চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ করতে বিদেশি ভাষার প্রয়োজন। ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যমরূপে বর্জন করার ফলে বাংলায় প্রচুর ইউরোপীয় শব্দ প্রবেশ করেছে। রচনার সঙ্গে পারম্পর্য রক্ষা করলে বিদেশি ভাষা ব্যবহারে অসুবিধা নেই। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগরের মত ব্যক্তিত্বরা অনায়াসেই আরবি-ফারসির ব্যবহার বাংলায় করে গেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তো এই দুই ভাষার বিরোধীদের ‘আহাম্মুখ’ বলেছেন। ‘আলাল’ ও ‘হুতোম’-এর ভাষার যেমন ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা আছে ঠিক তেমনি শংকর দর্শন, বসুমতী’র সম্পাদকীয় ভাষা কিংবা ‘বাঁকা চোখের ভাষা ও ভিন্ন। ভিন্ন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। এককথায় রচনার ভাষা। বিষয়ানানুগ হলে ভাষা সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যশালী হয়।

  3. ৪.৩ “ধর্ম বদলালেই জাতির চরিত্র বদলায় না।” – উৎস ও প্রসঙ্গ নির্দেশ কর। উদ্ধৃতির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।

    উত্তর: আলোচ্য উদ্ধৃতিটি প্রখ্যাত প্রবন্ধকার সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নব নব সৃষ্টি’ গল্প থেকে গৃহীত। নব নব সৃষ্টি গল্পের শেষে সৈয়দ মুজতবা আলী বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি ও বাঙালি চরিত্রের বিদ্রোহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। বৈষব পদাবলি কীর্তনে খাঁটি বাঙালিয়ানার পরিচয় ফুটে উঠেছে। মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ, পুরাণ ও ভাগবতের শ্রীরাধা যথাক্রমে বাঙালি পুরুষ ও বাঙালি নারী হয়ে উঠেছেন বৈষ্ণব পদকর্তাদের কলমে। আবার আরবী ও ফারসী ভাষার নানা শব্দও বাঙ্গালী নিঃসন্দেহে গ্রহণ করেছে। বাঙালি চরিত্রে বিদ্রোহের পরিচয় মিলেছে রাজনীতি, ধর্ম, সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেখানে সত্যশিব-সুন্দরের সন্ধান পেয়ে তা গ্রহণের বিরুদ্ধে বাধা এসেছে, সেখানে সেই বাধার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রকাশ দেখা গেছে। এই বৈশিষ্ট্য কেবল হিন্দুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যারা হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যেও সমানভাবে বিদ্যমান। এটিও বাঙালি জাতীয় চরিত্রের আর-একটি বৈশিষ্ট্য। তা হল ধর্ম যেন বাইরের আবরণ। আচ্ছাদনের পরিবর্তন দেহগত কাঠামোকে যেমন পালটায় না, তেমনি ধর্মও জাতিগত চরিত্রকে পালটাতে পারেনি বলেই বাঙালি চরিত্রের বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্যটি হিন্দু-মুসলমান এই ধর্মগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অটুট থেকেছে।

সমস্ত সমাধান আমাদের বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা WBBSE নির্দেশিকা অনুসারে প্রস্তুত করা হয়েছে। সমাধানগুলিতে পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নের উত্তর, ব্যাকরণ অনুশীলন এবং লেখার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
Advertisement

Complete Bengali Solutions কিনুন

অফলাইন অধ্যয়নের জন্য সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তর PDF ফরম্যাটে পান

Advertisement