খেয়া - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নবম শ্রেণীর বাংলা কবিতার সম্পূর্ণ সমাধান
খেয়া: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিশদ আলোচনা
কবি পরিচিতি: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্ম ও শিক্ষা: ৭ মে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মা সারদা দেবী। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর পিতামহ। প্রথাগত পড়াশোনায় তাঁর আগ্রহ ছিল না। তথ্যপ্রমাণ থেকে বোঝা যায় ক্যালকাটা ট্রেনিং অ্যাকাডেমি, ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্মাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি, সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল প্রভৃতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বল্পদিনের পড়ুয়া হিসেবে তিনি ফিফ্থ ইয়ার ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিলেন। এভাবে বিদ্যালয়ে পড়ার অনীহা লক্ষ করে পিতা দেবেন্দ্রনাথ যোগ্য শিক্ষকদের কাছে বিভিন্ন বিষয় বাড়িতেই পড়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন।
কাব্য চর্চা: ছেলেবেলাতেই তাঁর কাব্যচর্চা শুরু হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ভাগিনেয় অথচ বয়সে বড়ো জ্যোতিপ্রকাশ গঙ্গোপাধ্যায়ের উৎসাহে তিনি কবিতা রচনায় হাত দিয়েছিলেন। তাঁর এই কাব্যচর্চার কথা শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন দাদা সোমেন্দ্রনাথ। একাজে তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা জুগিয়েছিলেন তাঁরই নতুন বউঠান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরী দেবী এবং এ সময় মূলত তাঁরই উৎসাহে কাব্যগুরু হিসেবে তিনি মেনে নিয়েছিলেন কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীকে।
কাব্য সম্ভার: তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত'। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে কাব্যটি প্রকাশিত হলে সেকালের বিখ্যাত সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজের গলার মালা খুলে রবীন্দ্রনাথের গলায় পরিয়ে তাঁকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিলেন বাংলার কাব্যজগতে। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘প্রভাতসঙ্গীত’, ‘ছবি ও গান’, ‘কড়ি ও কোমল’, ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘চৈতালী’, ‘কণিকা’, ‘কল্পনা’, ‘কথা ও কাহিনী’, ‘ক্ষণিকা’, ‘নৈবেদ্য’, ‘স্মরণ’, ‘শিশু’, ‘খেয়া’। ‘গীতাঞ্জলি’, ‘গীতিমাল্য’, ‘গীতালি’-র মধ্যে এক অপূর্ব অধ্যাত্মচেতনা অনুভব করা যায়। এই পর্বে রচিত কবিতাগুলিকে স্বীকৃতি জানাতেই ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে সুইডিশ অ্যাকাডেমি ‘গীতাঞ্জলি' কাব্যের জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত করে। তারপর থেকে তাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা ও নাইট উপাধি ত্যাগ: পৃথিবীর ছোটো-বড়ো বিভিন্ন দেশে তিনি ভ্রমণ করেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন। শুধু কাব্যচর্চাই তিনি করেননি, একজন কর্মযোগীও ছিলেন। জীবনের সর্বস্বটুকু দিয়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। সমবায় প্রথায় গ্রামের মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণের চেষ্টা করেছেন। কৃষিক্ষেত্রে উন্নতির জন্য শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আবার একইসঙ্গে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা ও 'নাইট' উপাধি ত্যাগ দেশপ্রেমিক এই মানুষটির কণ্ঠ বিদেশি অত্যাচারের বিরুদ্ধেও গর্জে উঠেছে। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশের দেওয়া নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আন্দামান, হিজলির বন্দিশিবিরে ব্রিটিশ অত্যাচার চরমে উঠলে কবি তার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। সময়ে তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন মিত্রশক্তিকে সমর্থন করেছেন। ‘প্রান্তিক' কাব্যগ্রন্থ রচনাকাল থেকেই কবি পশ্চিমের আকাশে অনুভব করছিলেন বাতাসে নাগিনির নিশ্বাস, তাই তিনি উগ্র আধুনিকতাসর্বস্ব এই পশ্চিমি ঝঞ্ঝাকে ধিক্কার জানিয়েছেন। তবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ আস্থা রেখেছেন উপনিষদীয় ভাবনায়। তাই মানবসভ্যতার শোচনীয় পরিণামে ব্যথিত হলেও মানবেশ্বরের প্রতি আস্থায় অবিচল ছিলেন তিনি।
জীবনাবসান: ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ) বার্ধক্যজনিত শারীরিক অসুস্থতায় তাঁর মৃত্যু হয়।
উৎস
‘খেয়া’ কবিতাটি ‘চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের ১৩ সংখ্যক কবিতা। কবিতাটি ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
পূর্বকথা
জমিদারির কাজ দেখাশোনার জন্য মাঝে মাঝে বোটে করে নদীবক্ষে ঘুরে বেড়ানোর সময় নদীতীরবর্তী গ্রামের মানুষের সহজসরল জীবনে ছাপ ফেলেছিল কবির অন্তরে। তারই প্রেক্ষাপটে কবি ‘খেয়া’ কবিতাটি রচনা করেন।
বিষয় সংক্ষেপ
‘খেয়া’ কবিতাটি রূপক আশ্রিত কবিতা। নদীমাতৃক বাংলা দেশে খেয়া নৌকো দুটি গ্রামের মধ্যে ক্রমাগত যোগসূত্র স্থাপন করে চলে। কবির কাছে এই খেয়া শুধুমাত্র পারাপারের মাধ্যম নয়। এই খেয়া মানুষের জীবনের বহমানতার প্রতীকস্বরূপ হয়ে উঠেছে। পৃথিবীতে নানান সভ্যতার উত্থানপতন ঘটে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে নতুন নতুন ইতিহাস। কালের পর কাল এভাবেই পৃথিবীর বুকে জীবনপ্রবাহ বয়ে চলে। কিন্তু গ্রামীণ জীবন, খেয়া পারাপার এবং শান্ত- জীবনযাপন চিরপ্রবাহমান নদীর স্রোতের মতোই চিরকালীন চলতে থাকে।
নামকরণ
যে-কোনো সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রেই নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামকরণের মাধ্যমেই সাহিত্যের অন্তর্নিহিত বিষয় বা ভাবটি পাঠকের কাছে পরিস্ফুট হয়। রবীন্দ্রনাথ ‘চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘খেয়া’ কবিতাটিতে একদিকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় রক্তাক্ত পৃথিবী আর অন্যদিকে শান্ত-স্নিগ্ধ মানবিক সম্পর্ক-মাখা পল্লিজীবনের ছবি পাশাপাশি তুলে ধরেছেন। ‘খেয়া’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল জলযানের দ্বারা নদী বা খাল পারাপার। এর আর-একটি অর্থ হল নদী পারাপারের নৌকা। কোনো এক নাম-না-জানা নদীর দুই পারের দুটি গ্রাম সারা বাংলার পল্লিজীবনের প্রতিনিধিত্ব করছে এই কবিতায়। নদী পারাপারের নৌকাটিই যেন দু-পাশের দুটি গ্রামের মানুষকে আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধেছে। নিত্যদিন খেয়ানৌকায় নদী পারাপার করার সূত্রেই দু-পারের মানুষগুলির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়।
অন্যদিকে, নাগরিক সমাজ সবসময়ই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। সেখানে সব সময় চলে ক্ষমতা দখলের লড়াই— এক সাম্রাজ্যের পতনে আর-এক সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। তথাকথিত সভ্যতার অগ্রগতিতে মানুষের জীবনযাত্রার যেমন উন্নতি হয় তেমনি তা ডেকে আনে সমাজ ও পরিবেশের ধ্বংসকেও। তাই কবি বলেছেন সভ্যতার উন্নতিতে বিষ এবং অমৃত দুই ই উঠে আসে। নাগরিক জীবনের এই উত্থান-পতনে পল্লিগ্রামের জীবন কিন্তু এতটুকুও আন্দোলিত হয় না। আবহমান কাল ধরে তাদের জীবনযাত্রা একইভাবে বয়ে চলে। মানুষে-মানুষে নিবিড় সম্পর্কই গ্রামের জীবনযাত্রার মূলভিত্তি। খেয়ানৌকা তাদের এই সম্পর্কের সূত্র। তাই কবিতাটির ‘খেয়া’ নামকরণ প্রতীকী এবং সার্থক।
খেয়া: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খেয়া (কবিতা) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – নবম শ্রেণীর বাংলা প্রশ্ন ও উত্তর:
MCQ
- ১.১ ‘খেয়া’ কবিতাটি কার লেখা?
(A) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(B) নজরুল ইসলাম
(C) সুকুমার রায়
(D) নবীনচন্দ্র সেন
- ১.২ নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুদা — এই লাইনটিতে কীসের কথা বলা হয়েছে?
(A) সভ্যতার
(B) নগরের
(C) মানুষের
(D) যন্ত্রের
- ১.৩ “সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা-ক্ষুধা” —এখানে বোঝানো হয়েছে —
(A) সভ্যতার ধ্বংস ও সৃষ্টির কথা
(B) সভ্যতার পারস্পরিক বিভিন্নতার কথা
(C) সভ্যতার নতুন নতুন ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা-চাহিদা প্রবণতার কথা
(D) সভ্যতার দ্বন্দ্ব-দুর্যোগের কথা
- ১.৪ “উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুখা’—এখানে ‘হলাহল’ ও ‘সুধা’-র প্রকৃত স্বরূপটি হল —
(A) বিষ ও অমৃত
(B) উত্থানপতন
(C) দ্বন্দ্ব সর্বনাশ
(D) সভ্যতার কুফল ও সুফল
- ১.৫ “উঠে কত হলাহল’—এখানে ‘হলাহল’ শব্দের অর্থ হল –
(A) অমৃত
(B) সুধা
(C) সমুদ্র
(D) গরল
- ১.৬ ‘কেবা জানে নাম,’ বলতে কবি বুঝিয়েছেন —
(A) মানুষের নাম জানা যায় না
(B) গ্রাম দুটির নাম অজানা
(C) নদীটির নাম অজানা
(D) সভ্যতার নাম অজানা
- ১.৭ ‘দোঁহা-পানে চেয়ে আছে—’দোঁহা’ কারা?
(A) দুটি খেয়া
(B) দুটি নৌকা
(C) দুটি তীর
(D) দুটি গ্রাম
- ১.৮ ‘এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে’ এখানে ‘নদীস্রোত’ বলতে আসলে কবি বুঝিয়েছেন—
(A) নদীর জলস্রোত
(B) জীবনপ্রবাহ
(C) পৃথিবী
(D) কালস্রোত
- ১.৯ ‘এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে—’এখানে ‘খেয়া’ বলতে কবি বুঝিয়েছেন—
(A) মানবজীবনপ্রবাহ
(B) ছোটো নৌকা
(C) ছোটো ছোটো আকাঙ্ক্ষা
(D) কালস্রোত
- ১.১০ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘খেয়া’ কবিতাটি রচনা করেন-
(A) ১৮ চৈত্র, ১৩০০ বঙ্গাব্দে
(B) ১১ চৈত্র, ১৩০২ বঙ্গাব্দে
(C) ১৮ চৈত্র, ১৩০২ বঙ্গাব্দে
(D) ১৯ চৈত্র, ১৩০২ বঙ্গাব্দে
- ১.১১ “কত ফুটে আর টুটে”- কার কথা বলা হয়েছে?
(A) সোনার মুদ্রা
(B) সোনার পদক
(C) সোনার মুকুট
(D) সোনার কলম
- ১.১২ “এই খেয়া চিরদিন চলে _______” –
(A) জলস্রোতে
(B) নদীস্রোতে
(C) বায়ুস্রোতে
(D) জনস্রোতে
- ১.১৩ ‘আনাগোনা’ শব্দটির অর্থ –
(A) আসা
(B) যাওয়া
(C) আসা-যাওয়া
(D) ফেরা
- ১.১৪ পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব, কত সর্বনাশ’ — পৃথিবীতে এই দ্বন্দ্ব ও সর্বনাশ ঘটে চলার কারণ হলো –
(A) ক্রয়বিক্রয়
(B) সভ্যতার ধ্বংস ও সৃষ্টি
(C) প্রাকৃতিক নিয়ম
(D) কোনোটিই নয়
- ১.১৫ নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস——পৃথিবীতে নানাবিধ নতুন ইতিহাস গড়ে –
(A) দ্বন্দ্ব ও সর্বনাশ
(B) নদীস্রোত
(C) ঐ দুটি গ্রাম
(D) রাজপুরুষেরা
- ১.১৬ ‘খেয়া’ কবিতায় নদী কীসের প্রতীক?
(A) মৃত্যুর
(B) আনন্দের
(C) বন্ধুত্বের
(D) জীবনের
- ১.১৭ যা নদীস্রোতে পারাপার করে, তা হলো —
(A) জাহাজ
(B) খেয়া নৌকা
(C) খেয়া
(D) ভেলা
- ১.১৮ ‘খেয়ানৌকা’-র কাজ হল –
(A) মালপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়া
(B) যাত্রী পারাপার করা
(C) সীমান্তে পাহারা দেওয়া
(D) মাছ ধরা
- ১.১৯ ‘খেয়ানৌকা পারাপার করে নদীস্রোতে;’ – ‘পারাপার’ শব্দটির অর্থ হল –
(A) লাফঝাঁপ
(B) উড়ান
(C) এক তীর থেকে অন্য তীরে যাওয়া
(D) হাঁটাচলা
- ১.২০ ‘কেই যায়…কেহ আসে… হতে।’—
(A) ঘর, ঘরে
(B) গৃহে, গেহ
(C) ঘরে,ঘর
(D) বাড়ি, মাঠ
- ১.২১ ‘কেহ যায় ঘরে কেহ আসে ঘর হতে’- এখানে যে মূল ভাবনাটি প্রকাশ পেয়েছে,তা হল —
(A) মানুষ ঘরে-বাইরে যাতায়াত করে
(B) মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষ চিরকালের আবাসভূমিতে প্রবেশ করে কিংবা সেখান থেকে পুনরায় জীবনে ফিরে আসে
(C) মানুষ ঘরে-বাইরে অনন্তকাল ধরে যাতায়াত করে
(D) কোনোটিই নয়
- ১.২২ নদীর দুই তীরে আছে –
(A) দুটি নগর
(B) দুটি গ্রাম
(C) বাঁশবন
(D) আমবাগান
- ১.২৩ রবীন্দ্রনাথ চৈতালি কাব্যগ্রন্থের নামকরণ করেছেন-
(A) একটি নদীর নামে
(B) একটি গ্রামের নামে
(C) বছরের শেষ উৎপন্ন শস্যের নামে
(D) তাঁর এক আত্মীয়ার নামে
- ১.২৪ দুই তীরের দুটি গ্রামের সম্পর্ক হল-
(A) জানাশোনার
(B) রেষারেষির
(C) অপরিচয়ের
(D) কোনোটাই নয়
- ১.২৫ পৃথিবীতে নূতন নূতন কি গড়ে ওঠে?
(A) ইতিহাস
(B) সাম্রাজ্য
(C) নগর
(D) কারখানা
- ১.২৬ ‘সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে।’—টুটে’ বলতে বোঝায় –
(A) মুক্ত হয়
(B) ছিঁড়ে যায়
(C) ভেঙে যায়
(D) সরে যায়
- ১.২৭ সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে!’ — পঙ্ক্তিটিতে বোঝানো হয়েছে –
(A) রাজার অহংকার ও পতনকে
(B) রাজত্বের গড়ে ওঠাকে
(C) কোনো দেশের রাজার রাজ্যাভিষেক ও ধ্বংসকে
(D) রাজতন্ত্রের উত্থানপতনকে
- ১.২৮ সোনার….কত ফুটে আর টুটে।’ — শূন্যস্থান পূরণ —
(A) কুত্তল
(B) কিরীট
(C) মুকুট
(D) দেউল
- ১.২৯ নব নব সভ্যতার বিকাশে প্রেরণা জোগায় কারা?
(A) তৃষ্ণা-ক্ষুধা
(B) দ্বন্দ্ব, সর্বনাশ
(C) নদী, স্রোত
(D) সকাল, সন্ধ্যা
- ১.৩০ “রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে” – কবির রক্তপ্রবাহের মধ্যে কী ফেনিয়ে ওঠে?
(A) জিঘাংসা
(B) কৌতূহল
(C) ইতিহাসসচেতনতা
(D) সাম্রাজ্যের ধবংসের ছবি
- ১.৩১ খেয়া নৌকা বলতে বোঝায়-
(A) যে নৌকায় মালপত্র বহন করা যায়
(B) যে নৌকা নিয়ে মাছ ধরা হয়
(C) যে নৌকায় প্রমোদ ভ্রমণ করা হয়
(D) যে নৌকায় প্রাত্যহিক যাত্রী পারাপার করা হয়
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
- ২.১ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘খেয়া’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘খেয়া’ কবিতাটি চৈতালি কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।
- ২.২ পৃথিবীতে নতুন নতুন কী গড়ে ওঠে?
উত্তর: এখানে পৃথিবীতে নতুন নতুন ইতিহাস গড়ে ওঠার কথা বলা হয়েছে।
- ২.৩ “সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা।” কে আনাগোনা করে?
উত্তর: নদীর দুই তীরে দুই গ্রাম আছে, দুই গ্রামের মধ্যে আনাগোনা বা পরিচিতির কথা বলা হয়েছে।
- ২.৪ কোন্ কোন্ স্থানে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ চৈতালি কাব্যর কবিতাগুলি রচনা করেন?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাতিসর ও সাজাদপুরে অবস্থানকালে চৈতালি কাব্যের কবিতাগুলি রচনা করেন।
- ২.৫ নদীতে কী পারাপার করে?
উত্তর: নদীর একপারের মানুষকে বিভিন্ন প্রয়ােজনে অন্য পারে পৌছে দিতে নদীস্রোতে খেয়া নৌকা পারাপার করে।
- ২.৬ ‘খেয়া’ কবিতায় নদীর দুই তীরে কী আছে?
উত্তর: ‘খেয়া’ কবিতায় নদীর দুই তীরে পরস্পরের পরিচিত দুটি গ্রাম আছে।
- ২.৭ আছে জানাশােনা,-কাদের মধ্যে জানাশােনা রয়েছে?
উত্তর: গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদীর দুই তীরের মানুষদের মধ্যে জানাশােনা রয়েছে। একেই কবি দুই তীরের দুই গ্রামের জানাশােনা বলেছেন।
- ২.৮ খেয়ানৌকা বলতে কী বােঝ?
উত্তর: নদী বা বড়াে জলাশয় পারাপারের জন্য ব্যবহৃত ছােটো নৌকাকে খেয়া নৌকা বলা হয়ে থাকে।
- ২.৯ সকাল থেকে সন্ধ্যা দুই গ্রামের মানুষ কী করে?
উত্তর: সকাল থেকে সন্ধ্যা দুই গ্রামের মানুষ নানা প্রয়ােজনে একে অন্যের গ্রামে আনাগােনা অর্থাৎ যাতায়াত করে।
- ২.১০ দোঁহা-পানে চেয়ে আছে” – কারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে?
উত্তর: দুটি গ্রাম পরস্পর দুই গ্রামের দিকে চেয়ে আছে বা দোঁহা – পানে চেয়ে আছে।
- ২.১১ চৈতালি কাব্যটি কোন সময়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চৈতালি কাব্যগ্রন্থটি ১৩০৩ বঙ্গাব্দের চৈত্র সত্যপ্রসাদ গঙ্গােপাধ্যায়ের কাব্যগ্র্যাবলীর অন্তর্গত হয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
- ২.১২ শিরােনামসূচি অনুযায়ী ‘খেয়া’ কবিতাটি চৈতালি কাব্যগ্রন্থের কত সংখ্যক কবিতা?
উত্তর: শিরােনামসূচি অনুযায়ী ‘খেয়া’ কবিতাটি চৈতালি কাব্যগ্রন্থের উনিশ সংখ্যক কবিতা।
- ২.১৩ চৈতালি কাব্যগ্রন্থে মােট কতগুলি কবিতা রয়েছে?
উত্তর: চৈতালি কাব্যগ্রন্থে মােট ৭৯টি কবিতা রয়েছে।
- ২.১৪ চৈতালি কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা কোন বাংলা মাসে লিখিত?
উত্তর: চৈতালি কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা চৈত্র মাসে লিখিত, কবি তাই বছরের শেষ উৎপন্ন শস্যের নামেই এই কবিতাটির নামকরণ করেছেন।
- ২.১৫ ‘খেয়া’ কবিতাটিতেই পঙক্তি রয়েছে?
উত্তর: এই কবিতাটিতে মোট ১৪টি পঙক্তি রয়েছে।
- ২.১৬ পৃথিবীতে নতুন নতুন কী গড়ে ওঠে?
উত্তর: পৃথিবীতে নতুন নতুন ইতিহাস অর্থাৎ সামাজিক ও রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের কাহিনি ও ক্ষমতা বদলের গল্প গড়ে ওঠে।
- ২.১৭ “সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা।” কে আনাগোনা করে?
উত্তর: সকাল থেকে সন্ধ্যা দুই গ্রামের মানুষের খেয়া পারাপার করে আনাগোনার কথা বলা হয়েছে।
- ২.১৮ “সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা—এই আনাগোনা কোথায় হয়ে যাবে?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত “খেয়া” কবিতার প্রশ্নোক্ত পঙক্তিটিতে উল্লেখিত এই আনাগোনা নদীতীরের গ্রাম দুটিতে হয়ে থাকে।
- ২.১৯ ‘খেয়া’ কবিতায় বাস্তব সভ্যতার কী উঠে আসে?
উত্তর: ‘খেয়া’ কবিতায় বাস্তব সভ্যতার নব নব তৃষ্ণা-ক্ষুধা উঠে আসে।
- ২.২০ “সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা—”—কবি ‘তৃষ্ণা’ ও ‘ক্ষুধা’ শব্দ দুটি দিয়ে কী বােঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: ‘তৃষ্ণা’ ও ‘ক্ষুধা’ শব্দ দুটি দিয়ে কবি সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের বেড়ে যাওয়া চাহিদাকে বুঝিয়েছেন।
- ২.২১ ‘খেয়া’ কবিতায় নদীর দুই তীরে কী আছে?
উত্তর: খেয়া কবিতায় নদীর দুই তীরে আছে দুই গ্রাম।
ব্যাখ্যাভিত্তিক
- ৩.১ “সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা-” – কবি ‘তৃষ্ণা’ ও ‘ক্ষুধা’ শব্দ দুটি দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তৃষ্ণার্ত ব্যাক্তি জল পান করে তার তৃষ্ণা নিবারণ করতে চান। ক্ষুধার্ত ব্যাক্তি খাদ্য খেয়ে তার ক্ষুধা নিবৃত্তি করেন। বিভিন্ন প্রকার পানীয় পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করা যায় আবার বিভিন্ন ধরণের খাবার খেয়েও মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তি হয়। কবি বলেছেন তেমন ভাবেই উন্নততর সভ্যতাকে লাভ করার জন্য মানুষের মনের এই তৃষ্ণা ও ক্ষুধা চিরন্তন। দেশকে ও সভ্যতাকে আরো উন্নত করে তোলার চেষ্টা মানুষের সহজাত। শিল্পক্ষেত্রে, কৃষিক্ষেত্রে, শিক্ষা ও বিজ্ঞান সবক্ষেত্রেই মানুষ চেষ্টা করেছে উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে ও তার জন্য মনুষ্য জাতি করে চলেছে নিত্য নতুন আবিস্কার। ‘চাকা’ আবিস্কার করেই মানুষ থেমে থাকেনি, আকাশপথের জন্যও উড়োজাহাজ আবিস্কার করেছে। সভ্যতার জয়যাত্রায় বহু অসাধ্য সাধন সম্ভব হলেও যা কিছু অজানা যা কিছু অধরা, তাকে জয় করার এবং তাকে জানার ‘নব নব ক্ষুধা ও তৃষ্ণা’ মানুষের মনে সর্বদা বর্তমান।
- ৩.২ দোঁহা-পানে চেয়ে আছে” – এই কথার অর্থ কী?
উত্তর: এই পদ্যাংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের ‘খেয়া’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। কবি এই কবিতাটি পাতিসরের নাগর নদীর বোটেতে বসে লিখেছিলেন। তিনি তাঁর নৌকার জানলার খড়খড়ি দিয়ে দুটি গ্রাম দেখতে পেতেন। একদিকে গ্রাম ছিল শস্যশ্যামলা অন্যদিকের গ্রামটি ছিল মানুষের বসবাস। এই দুটি গ্রামের মধ্যে খেয়া নৌকার মাধ্যমে চলত অবিরাম আনাগোনা। বিভিন্ন প্রয়োজনে একপাড়ের মানুষ যেত অন্যপাড়ে। এখানে ‘কারা’ বলতে গ্রামের মানুষদেরই কথা বলা হয়েছে ও ‘কোথায়’ বলতে এই গ্রাম দুটির কথাই বোঝানো হয়েছে। এই দুটি গ্রামের মানুষজনের জীবনযাত্রা খুবই সরল। তাঁদের পৃথিবী এই দুটি গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিশ্বজগতে উত্থান পতন তাঁদের স্পর্শ করে না। এই দুটি গ্রাম একে ওপরের পরিপূরক। দুটি গ্রামের অধিবাসীবৃন্দ যাবতীয় প্রয়োজন মেটায় এই দুটি গ্রাম থেকে। ‘খেয়া’ নৌকার মাধ্যমে এই দুটি গ্রামের মধ্যে রয়েছে নিত্য যোগাযোগ। একে অপরের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে তাঁদের জীবনযাত্রা। তাই কবি বলেছেন ‘যে দোঁহা-পানে চেয়ে আছে’।
- ৩.৩ কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে।”— এই পঙুক্তিটির মধ্য দিয়ে কাব কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: আলােচ্য পঙক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। এই কবিতায় কবি নদীর দুই পাড়ে দুটি নাম না-জানা গ্রামের মধ্য দিয়ে সারা বাংলার পল্লিসমাজের শান্ত স্নিগ্ধ ছবিকে তুলে ধরেছেন। গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা শহরের থেকে অনেক বেশি সহজসরল। সেখানে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক অনেক নিবিড়। গ্রামের সাধারণ মানুষ খেয়া নৌকা করে কেউ কাজ সেরে ঘরে ফেরে, কেউবা ঘর থেকে বেরিয়ে কাজে যায়। ক্ষমতা দখলের রক্তাক্ত লড়াইয়ে তারা শামিল নয়। এরাই প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর আদি, অকৃত্রিম জীবনধারার বাহক।
- ৩.৪ “পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব, কত সর্বনাশ,”—এ কথা বলতে কবি কী বােঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: উদ্ভূত পক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘খেয়া’ কবিতা থেকে গৃহীত। কবিতাটিতে কবি নাগরিক জীবন ও গ্রামীণ জীবনের একটি তুলনামূলক ছবি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। নাগরিক জীবন ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে উত্তাল। গ্রামের তুলনায় নগরে সুযোগসুবিধা সুখস্বাচ্ছন্দ্য অনেক বেশি কিন্তু সেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের যোগ খুব কম। মানুষের সুখের চাহিদা ও বাসনা সেখানে এত বেশি যে তারা নিজেরাই পরস্পর হানাহানি ও দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। এই হিংসা ও লড়াইই পৃথিবীর বুকে ডেকে আনে চরম সর্বনাশ।
- ৩.৫ কেবা জানে নাম/দেহা-পানে চেয়ে আছে দুইখানি ম’-শ্বতাংশটির মাধ্যমে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: চৈতালি কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘খেয়া’ কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ কোনাে নির্দিষ্ট গ্রাম নয়, সারা বাংলার যে-কোনাে গ্রামকে বুঝিয়েছেন বলেই নাম-না-জানা দুটি গ্রামের উল্লেখ করেছেন। দুটি গ্রাম একে অন্যের দিকে চেয়ে থাকে কারণ তাদের মধ্যে রয়েছে একটি নদী। খেয়া নৌকা তাদের দুই তীরকে যুক্ত করে, তাদের মধ্যে যােগসূত্র তৈরি করে। নদীর দুই পারে দুটি গ্রামের মানুষকে আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধে এই খেয়া নৌকাই। উক্তিটি মানুষে-মানুষে সেই নিবিড় সম্পর্কেরই ইঙ্গিত দেয়।
- ৩.৬ “সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা।” – কারা কোথায় আনাগোনা করে? এই আনাগোনার মধ্য দিয়ে কবি কোন্ সত্য প্রকাশ করতে চেয়েছেন?
উত্তর: এই পদ্যাংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের অর্ন্তভূক্ত ‘খেয়া’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। কবি এই কবিতাটি পাতিসরের নাগর নদীতে বোটে বসে লিখেছিলেন। তিনি তাঁর নৌকার জানলার খড়খড়ি দিয়ে দুটি গ্রাম দেখতে পেতেন। এই দুটি গ্রামের মধ্যে খেয়া নৌকার মাধ্যমে চলত অবিরাম আনাগোনা। বিভিন্ন প্রয়োজনে একটি গ্রামের মানুষ যেত অন্য আরেকটি গ্রামে। এখানে ‘কারা’ বলতে গ্রামের মানুষদেরই কথা বলা হয়েছে ও ‘কোথায়’ বলতে এই গ্রাম দুটির কথাই বোঝানো হয়েছে। এই আনাগোনার মধ্য দিয়ে কবি যে চিরন্তন সত্যকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তা হল- ‘নদীর স্রোত’ হল সময় বা কালের প্রতীক। ‘খেয়া’ হল আমাদের জীবনতরীর প্রতীক। সকাল হল ‘জীবন প্রভাত’ আর সন্ধ্যা হল জীবন সায়াহ্ন মৃত্যুতে যার পরিসমাপ্তি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের জীবনতরী কাল প্রবাহে প্রবাহমান।
- ৩.৭ ‘রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া ওঠে’ – রক্তপ্রবাহে কী ফেনিয়ে ওঠে?
উত্তর: পৃথিবীর ইতিহাসে কত যুদ্ধ, লড়াই, দ্বন্দ্ব দেখতে পাওয়া যায়। সর্বদাই কোনো ক্ষমতাশীল দেশ অন্যদেশকে পদানত করার চেষ্টা করে চলেছে। সবসময় ঘটে চলেছে কত ক্ষমতা, শক্তি, দম্ভের লড়াই ও শক্তির প্রদর্শন। যে শক্তিশালী- সে দুর্বলকে গ্রাস করার চেষ্টা করে, কোথাও বা সমশক্তিমান দুটি দেশ পরস্পরের মধ্যে লড়াই করে চলে। এই ঘটনা আদি অনন্তকাল ধরে ঘটে চলেছে। তার ফলে কত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে, রক্তপাত হয়েছে, মানুষের এই ক্ষমতার লড়াই-এ কত সাধারণ মানুষের প্রাণ বলিদান হয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে একদল জিতেছে ও একদল পরাজিত হয়েছে। কারোর মাথায় রাজার মুকুট উঠেছে, কেউ হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত। ক্ষমতার শিখরে আরোহণ করার জন্য অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস রচিত হয়েছে দম্ভের প্রদর্শন এবং অপরের সম্পদকে কুক্ষিগত যার মধ্যেদিয়ে নিজ শক্তি ক্ষমতা করার বাসনা প্রকাশিত হয়েছে। যা কবির ভাষায় ‘রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে’।
- ৩.৮ “এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে—-—উধৃতিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো?
উত্তর: উধৃতিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ কবিতা থেকে নেওয়া। এই কবিতায় কবি কৃত্রিম ও জটিল নাগরিক জীবন এবং সরল ও সাদাসিধে গ্রামীণ জীবনের ছবি পাশাপাশি তুলে ধরেছেন। একদিকে তিনি দেখিয়েছেন সভ্যতার গর্বে, ক্ষমতার অহংকারে কত রক্তাক্ত নাগরিক জীবনকে। অপরদিকে নগরের কোলাহল থেকে দূরে বহমান, দেখিয়েছেন কাল ধরে গ্রামবাংলার প্রকৃতির কোলে শান্ত-স্নিগ্ধ গতি বয়ে চলেই মানুষের জীবনধারা। কবিতাটিতে খেয়ানৌকা সেই মানবিক সম্পর্কের যােগসূত্ররূপে আবহমানকাল থেকেই নদী পারাপার করে চলছে।
বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী
- ৪.১ “এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে” – কোন্ প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে? মন্তব্যটির তাৎপর্য লেখাে।
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ তার ‘খেয়া’ কবিতায় নদী-তীরবর্তী দুটি গ্রামের জানাশােনা ও সম্পর্কের কথা বলেছেন। নাম-না-জানা সেই দুটি গ্রাম যেন গভীর আত্মীয়তায় পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর তাদের মধ্যে সম্পর্কের সূত্র রচনা করে নদীতে পারাপার করা খেয়া নৌকা। নৌকায় প্রতিদিনের বিরতিহীন যাতায়াত প্রসঙ্গেই মন্তব্যটি করা হয়েছে। নদীতে খেয়ানৌকার চলাচল আসলে গ্রামীণ জীবনের অনায়াস বিস্তারের দিকে ইঙ্গিত করে। খেয়া নৌকায় করে দুই তীর থেকে মানুষেরা ঘরে যায় বা ঘর থেকে বাইরে যায়, তৈরি হয় দুটি গ্রামের আত্মীয়তার সম্পর্ক। যখন পৃথিবীর ইতিহাস আন্দোলিত হয় যুদ্ধ রক্তপাতের ঘটনায় ঠিক তখনই তার বিপরীতে খেয়া নৌকার চলাচল অব্যাহত থাকে। খেয়ানৌকার চিরকালীন যাতায়াত যেন জীবনের স্বচ্ছন্দ প্রবাহকেই নির্দেশ করে যায়। রাজত্বের অবসান ঘটে কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন একইভাবে বহমান থাকে— এ কথাই কবি “এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে” পঙক্তিটির সাহায্যে বােঝাতে চেয়েছেন।
- ৪.২ সােনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে!”—মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করাে এবং সঙ্গটি উল্লেখের কারণ আলােচনা করাে।
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘খেয়া’ কবিতায় প্রশ্নোল্লিখিত মন্তব্যটির দ্বারা সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনকে বােঝাতে চেয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাস যুগে যুগে বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কের ক্ষমতা দখলের লালসায় রক্তাক্ত হয়েছে। তৈরি হয়েছে ইতিহাসের নতুন নতুন অধ্যায়। দেশদেশান্তর যে প্রবল পরাক্রান্ত শাসকের শাসনে কেঁপে উঠেছে তাকেই পরবর্তীতে ক্ষমতা হারাতে হয় নতুন কোনাে শাসকের কাছে। ‘সােনার মুকুট’ এভাবেই যেমন কারুর মাথায় শােভা পায়, আবার তা খসেও পড়ে কারুর মাথা থেকে। রবীন্দ্রনাথ তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বােঝাতে চেয়েছেন যে ইতিহাসে যুদ্ধ-রক্তপাত-ক্ষমতাদখল ইত্যাদি হয়তাে সত্য, কিন্তু মানুষের যে সহজ অনাবিল জীবনযাত্রা তাতে কোনাে প্রভাব এই উত্থান-পতনের ফলে পড়ে না। খেয়ানৌকার মাধ্যমে দুটি গ্রাম সেখানে নিজেদের যুক্ত করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা চলে মানুষের আনাগােনা। কেউ ঘরে আসে, কেউ ঘর থেকে যায়। মানুষের এই স্বাভাবিক জীবনযাপনে, পারস্পরিক সম্পর্কে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন কিংবা রক্তাক্ততা কোনাে প্রভাবই ফেলতে পারে না। জীবনের এই বিরতিহীন চলাচলকে বােঝাতে গিয়েই তুলনা হিসেবে ‘সােনার মুকুট’ এর প্রতিষ্ঠা এবং ছিন্ন হওয়ার কথা কবি বলেছেন।
- ৪.৩ ‘খেয়া’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কবিতার ক্ষেত্রে তার বিষয়বস্তু অনুযায়ী নামকরণ হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথের ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘খেয়া’ কবিতাটিতে কবি নাগরিক জীবন এবং গ্রামীণ জীবনের তুলনামূলক দুটি ছবি পাশাপাশি তুলে ধরেছেন। এক নাম-না-জানা নদীর দু-পাশে দুটি নাম-না-জানা গ্রাম সারা বাংলার গ্রামজীবনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজসরল-অনাড়ম্বরভাবে তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করে। নাগরিক জীবনের সুবিধা সেখানে নেই, কিন্তু খেয়ানৌকা সেখানে নদীর ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সেতু তৈরি করে। অন্যদিকে, নাগরিক জীবনে সুখস্বাচ্ছন্দ্যের অভাব নেই, সেখানে অভাব শুধু মানবিক সম্পর্কের। তাই ক্ষমতার লোভে মানুষ সেখানে খুব সহজেই একে অন্যকে রক্তাক্ত করে। এক সাম্রাজ্যের পতনে আর-এক সাম্রাজ্যের উত্থান হয়। তথাকথিত সভ্যতার অগ্রগতিতে মানুষের জীবনযাত্রার যেমন উন্নতি হয় তেমনি তা ডেকে আনে সমাজ ও পরিবেশের ধ্বংসকেও। তাই কবি বলেছেন সভ্যতার উন্নতিতে বিষ এবং অমৃত দুই-ই উঠে আসে। নাগরিক জীবনের এই উত্থান-পতনে পল্লীগ্রামের জীবন কিন্তু একটুকুও আন্দোলিত হয় না। আবহমান কাল ধরে তাদের জীবনযাত্রা একই ভাবে বয়ে চলে। মানুষে-মানুষে নিবিড় সম্পর্কই গ্রামের জীবনযাত্রার মূলভিত্তি। খেয়ানৌকা তাদের এই সম্পর্কের সূত্র। তাই কবিতাটির ‘খেয়া’ নামকরণ সার্থক ও যথাযথ হয়েছে।
- ৪.৪ খেয়া’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নগর ও গ্রামীণ জীবনের যে তুলনামূলক ছোবিটি তুলে ধরেছেন তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করাে।
উত্তর: ‘খেয়া’ কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদিকে পৃথিবীর ক্ষমতা-লোভী রক্তাক্ত নাগরিক জীবন আর অন্যদিকে শান্ত-স্নিগ্ধ মানবিক সম্পর্কের ডোরে বাঁধা গ্রামজীবনের ছবি পাশাপাশি তুলে ধরেছেন। একটি নাম না-জানা নদীর দুপাশের দুটি নাম না-জানা গ্রাম এখানে সারা বাংলার পল্লীগ্রামের কথা তুলে ধরছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজসরলভাবে তাদের জীবন কাটায়। নদী পারাপারের খেয়া নৌকাটিই দুপাশের দুটি গ্রামের মানুষকে আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধেছে। অন্যদিকে, নাগরিক জীবনে সুখস্বাচ্ছন্দ্য অনেক বেশি থাকলেও মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের যোগ খুব কম। তাই ক্ষমতা বা সম্পদের লোভে তারা একে অন্যকে আঘাত করতেও দ্বিধাবোধ করে না। এক সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গেই ঘটে আর-এক সাম্রাজ্যের উত্থান। সভ্যতার অগ্রগতি মানুষকে উন্নততর জীবন দিয়েছে। নাগরিক মানুষ প্রকৃতির থেকে অনেক দূরে সরে গেছে, অজস্র উন্নত মারণাস্ত্র তাদের পরস্পরের মধ্যেও তৈরি করেছে অসীম ব্যবধান। নগরজীবনের এই উত্থান-পতন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে অনেক দূরে পৃথিবীর এককোণে পল্লীগ্রামের জীবন কিন্তু আবহমান কাল ধরে একইরকমভাবে বয়ে চলেছে। কবিতাটিতে সভ্যতার অহংকারে গর্বিত, হৃদয়হীন নাগরিক জীবনের থেকে সহজসরল-অনাড়ম্বর এবং মানবিক পল্লিজীবনের প্রতিই রবীন্দ্রনাথের গভীর ভালোবাসা ব্যক্ত হয়েছে।
- ৪.৫ “উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা!” – কোন প্রসঙ্গে কবি এই মন্তব্যটি করেছেন? উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: এই পদ্যাংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের অর্ন্তভূক্ত ‘খেয়া’ কবিতা থেকে এই উদ্ধৃতটি নেওয়া হয়েছে। সভ্যতার নব নব আবিষ্কারের কথা এবং তার ফলাফল এর প্রসঙ্গে কবি এই উক্তি করেছেন। আলোচ্য উক্তিটির তাৎপর্য – সভ্যতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্ঠায় মানব জাতি কৃষিক্ষেত্রে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে, শিল্পে ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও অবিরাম উন্নতি করার চেষ্টা করে। যেমন লাঙল জায়গায় এসেছে ট্রাক্টর, গরুর গাড়ির জায়গায় এসেছে ট্রেন। আকাশপথে পাড়ি দিয়েই আমরা দূর দূরান্তে পৌঁছাতে পারি অল্প সময়ের মধ্যেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানও অনেক উন্নত। সভ্যতার জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। সভ্যতার নূতন নূতন আবিস্কারকেই কবি ‘সুধা’ বলতে চেয়েছেন। আমরা পুরান থেকে জানতে পারি যে সুধা বা অমৃতের সঙ্গে বিষও বা হলাহলও উঠেছিল। সভ্যতার অগ্রগতি যদি অমৃত হয় তবে তার হলাহলও আমাদের গ্রহণ করতে হবে। সভ্যতার অগ্রগতি যেমন আমাদের জীবনে অনেক সুখ স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে তেমনই আবার অভিশাপও বয়ে নিয়ে এসেছে। যেমন আমরা বলতে পারি জাপানের হিরোশিমা, নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের ফলে শুধু অনেক মানুষ নিহত বা আহত হননি, বিগত বেশ কিছু প্রজন্ম ধরে ঘটনার অভিশাপও বহন করে নিয়ে চলেছেন। মানুষের ঘরে ঘরে এখন শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র জীবনযাত্রাকে স্বাচ্ছন্দ্য দান করলেও ওজোনস্তরে দেখা দিয়েছে ফাটল। নিজেদের সুবিধার্থে মানুষ বন কেটে বসতি তৈরি করেছে, ফলে আজ বিশ্বে অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি হয়েছে, আমরা এখন বিশ্ব উষ্ণায়নের শিকার। এগুলি হল সভ্যতার হলাহল। সভ্যতার সুধার সঙ্গে যার অচ্ছেদ্য সম্পর্ক।
অন্যান্য বাংলা অধ্যায় (নবম শ্রেণী)
বাংলা Resources
Complete Bengali Solutions কিনুন
অফলাইন অধ্যয়নের জন্য সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তর PDF ফরম্যাটে পান