অধ্যায় ৯: এশিয়া মহাদেশ (Class VII Geography Solutions)
WBBSE-র সপ্তম শ্রেণীর ভূগোল বইয়ের নবম অধ্যায় 'এশিয়া মহাদেশ'-এর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পভিত্তিক (MCQ), অতি সংক্ষিপ্ত (SAQ) এবং রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর এখানে আলোচনা করা হলো। সমস্ত প্রশ্ন প্রদত্ত PDF পাঠ্যপুস্তক থেকে তৈরি করা হয়েছে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলী (MCQ)
পৃথিবীর বৃহত্তম মহাদেশ কোনটি?
'চরম বৈশিষ্ট্যের মহাদেশ' কাকে বলা হয়?
পৃথিবীর ছাদ' নামে পরিচিত কোনটি?
স্থলভাগের উচ্চতম অংশ কোনটি?
স্থলভাগের নিম্নতম অংশ কোনটি?
পৃথিবীর বৃহত্তম হ্রদ কোনটি?
পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল স্থান কোনটি?
পৃথিবীর বৃহত্তম সরলবর্গীয় বনভূমি কোনটি?
এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশকে একত্রে কী বলা হয়?
এশিয়া ও ইউরোপকে পৃথক করেছে কোন পর্বত?
এশিয়া ও আফ্রিকাকে পৃথক করেছে কোনটি?
হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতা কোন নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল?
মেসোপটেমিয়া সভ্যতা কোন নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল?
চিন সভ্যতার আঁতুড়ঘর কোন নদী উপত্যকা?
এশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত প্রধান পর্বতগ্রন্থি কোনটি?
হিমালয় ও কুয়েনলুন পর্বতের মাঝে কোন মালভূমি অবস্থিত?
পন্টিক ও টরাস পর্বতের মাঝে কোন মালভূমি অবস্থিত?
পৃথিবীর বৃহত্তম সমভূমি কোনটি?
তুরানের নিম্নভূমি কোন সাগরের চারপাশে অবস্থিত?
এশিয়ার উত্তর দিকে প্রবাহিত একটি নদী হলো-
এশিয়ার দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত একটি নদী হলো-
টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মিলিত প্রবাহের নাম কী?
'স্বর্ণরেণুর নদী' কাকে বলা হয়?
'পীত নদী' কাকে বলা হয়?
এশিয়ার দীর্ঘতম নদী কোনটি?
নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলে কোন ধরনের উদ্ভিদ দেখা যায়?
কোন জলবায়ু অঞ্চলে শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়?
মরু অঞ্চলে কী ধরনের উদ্ভিদ জন্মায়?
সাইবেরীয় জলবায়ু অঞ্চলে কোন অরণ্য দেখা যায়?
তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চলে কোন উদ্ভিদ দেখা যায়?
পাকিস্তানের জেকোবাবাদ এশিয়ার কোন জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত?
সেজুয়ান অববাহিকাকে 'রেড বেসিন' বলা হয় কেন?
'চিনের ধানের গোলা' কোন প্রদেশকে বলা হয়?
'চিনের শস্য ভান্ডার' বলা হয় কোন অঞ্চলকে?
'এশিয়ার হল্যান্ড' বা 'চিনের হল্যান্ড' কাকে বলা হয়?
চিনের বৃহত্তম শহর ও শিল্পকেন্দ্র কোনটি?
'চিনের ম্যাঞ্চেস্টার' কাকে বলা হয়?
জাপানের বৃহত্তম দ্বীপ কোনটি?
কান্টো সমভূমি জাপানের কোন অংশে অবস্থিত?
জাপানের শ্রেষ্ঠ শিল্পাঞ্চলের নাম কী?
জাপানের রাজধানী কোনটি?
জাপানের সর্ববৃহৎ বন্দর কোনটি?
কোন শহর জাপানের আদর্শ পরিবেশ-বান্ধব শহর হিসেবে স্বীকৃত?
বিশ্বের কত শতাংশ খনিজ তেল দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় সঞ্চিত আছে?
OPEC-এর পুরো নাম কী?
পৃথিবীর বৃহত্তম খনিজ তেল উত্তোলন কেন্দ্র কোনটি?
পৃথিবীর বৃহত্তম সামুদ্রিক তৈলখনি কোনটি?
সৌদি আরবের একটি প্রধান তৈলখনি হলো-
ইরানের একটি প্রধান তৈলখনি হলো-
ইরাকের প্রধান তৈলখনি কোনটি?
অতি সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্নাবলী (SAQ)
এশিয়াকে 'চরম বৈশিষ্ট্যের মহাদেশ' বলা হয় কেন?
উত্তর: এই মহাদেশে পৃথিবীর উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ (মাউন্ট এভারেস্ট), নিম্নতম স্থলভাগ (মরুসাগর), সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল স্থান (মৌসিনরাম) এবং প্রায় সব ধরনের জলবায়ু ও ভূমিরূপের বৈচিত্র্য দেখা যায়, তাই এশিয়াকে চরম বৈশিষ্ট্যের মহাদেশ বলে।
এশিয়া মহাদেশের দুটি প্রাচীন নদীমাতৃক সভ্যতার নাম লেখো।
উত্তর: সিন্ধু নদের তীরে হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতা এবং টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মেসোপটেমিয়া সভ্যতা।
ইউরেশিয়া কী?
উত্তর: এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশ দুটি একটি অখণ্ড স্থলভাগের অংশ, যা ইউরেশিয়া নামে পরিচিত।
এশিয়ার দুটি প্রধান পর্বত গ্রন্থির নাম কী?
উত্তর: পামীর পর্বত গ্রন্থি এবং আর্মেনীয় পর্বত গ্রন্থি।
পামীর গ্রন্থি থেকে নির্গত দুটি পর্বত শ্রেণির নাম লেখো।
উত্তর: হিমালয় এবং কারাকোরাম।
আর্মেনীয় গ্রন্থি থেকে নির্গত দুটি পর্বত শ্রেণির নাম লেখো।
উত্তর: পন্টিক এবং টরাস।
এশিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত দুটি প্রাচীন মালভূমির নাম লেখো।
উত্তর: দাক্ষিণাত্য মালভূমি এবং আরবের মালভূমি।
সাইবেরিয়ার সমভূমি কোন কোন নদীর পলি দ্বারা গঠিত?
উত্তর: ওব, ইনিসি ও লেনা নদীর পলি দ্বারা সাইবেরিয়ার সমভূমি গঠিত।
এশিয়ার উত্তরের নদীগুলিতে প্রায়ই বন্যা হয় কেন?
উত্তর: উত্তরের নদীগুলির মোহনা হিমমণ্ডলে অবস্থিত হওয়ায় বছরের বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকে। তাই পার্বত্য অঞ্চলের জল মোহনায় বাধা পেয়ে বন্যা সৃষ্টি করে।
টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মিলিত প্রবাহ কী নামে পরিচিত?
উত্তর: টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মিলিত প্রবাহ সাত-এল-আরব নামে পরিচিত।
হোয়াং-হো নদীকে 'পীত নদী' বলা হয় কেন?
উত্তর: হোয়াং-হো নদী হলুদ রঙের পলিযুক্ত জল বহন করে বলে একে 'পীত নদী' বা হলুদ নদী বলা হয়।
ইয়াংসিকিয়াং নদীকে 'স্বর্ণরেণুর নদী' বলা হয় কেন?
উত্তর: এই নদীর পলি সোনালী রঙের হওয়ায় একে 'স্বর্ণরেণুর নদী' বলা হয়।
এশিয়া মহাদেশের জলবায়ুর বৈচিত্র্যের দুটি কারণ লেখো।
উত্তর: জলবায়ুর বৈচিত্র্যের দুটি কারণ হলো—অক্ষরেখার ব্যাপক অবস্থান এবং সমুদ্র থেকে দূরত্ব।
ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: এই জলবায়ু অঞ্চলে আর্দ্র শীতকাল এবং শুষ্ক গ্রীষ্মকাল দেখা যায়, অর্থাৎ শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়।
তৈগা কী?
উত্তর: রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম সরলবর্গীয় বৃক্ষের বনভূমি তৈগা নামে পরিচিত।
'রেড বেসিন' কাকে বলা হয়?
উত্তর: চিনের সেজুয়ান অববাহিকা লাল রঙের বেলে পাথর দিয়ে তৈরি বলে একে 'রেড বেসিন' বা লাল অববাহিকা বলা হয়।
চিনের 'ধানের গোলা' কাকে বলে?
উত্তর: হুনান প্রদেশে প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপাদিত হওয়ায় এই প্রদেশকে 'চিনের ধানের গোলা' বলা হয়।
চিনের 'শস্য ভান্ডার' কাকে বলে?
উত্তর: ইয়াংসিকিয়াং নদীর মধ্য অববাহিকায় প্রচুর পরিমাণে শস্য উৎপাদন হয় বলে একে 'চিনের শস্য ভান্ডার' বলা হয়।
'চিনের ম্যাঞ্চেস্টার' কোন শহরকে বলা হয় এবং কেন?
উত্তর: সাংহাই শহরকে 'চিনের ম্যাঞ্চেস্টার' বলা হয় কারণ এখানে কার্পাস বয়ন শিল্পে প্রভূত উন্নতি ঘটেছে।
জাপানের বৃহত্তম দ্বীপ ও রাজধানীর নাম কী?
উত্তর: জাপানের বৃহত্তম দ্বীপ হনসু এবং রাজধানী টোকিও।
কিহিন শিল্পাঞ্চল কী?
উত্তর: জাপানের টোকিও উপসাগরের ধারে গড়ে ওঠা টোকিও-ইয়োকোহামা শিল্পাঞ্চল কিহিন শিল্পাঞ্চল নামেও পরিচিত।
ইয়োকোহামাকে জাপানের বৃহত্তম বহির্বন্দর বলা হয় কেন?
উত্তর: টোকিও বন্দরের কাছে গভীরতা কম হওয়ায় বড় জাহাজ ঢুকতে পারে না, তাই ইয়োকোহামা বন্দরটি জাপানের বৃহত্তম বহির্বন্দর হিসেবে কাজ করে।
OPEC কী?
উত্তর: OPEC হলো খনিজ তেল রপ্তানিকারক দেশগুলির একটি সংগঠন, যার পুরো নাম Organisation of Petroleum Exporting Countries।
সৌদি আরবের দুটি বিখ্যাত তৈলখনি অঞ্চলের নাম লেখো।
উত্তর: ঘাওয়ার (বিশ্বের বৃহত্তম) এবং সাফানিয়া (বিশ্বের বৃহত্তম সামুদ্রিক)।
দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দুটি প্রধান খনিজ তেল উত্তোলনকারী দেশের নাম লেখো।
উত্তর: সৌদি আরব এবং ইরান।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলী
-
এশিয়াকে 'চরম বৈশিষ্ট্যের মহাদেশ' বলা হয় কেন? উদাহরণসহ আলোচনা করো।
এশিয়া মহাদেশকে 'চরম বৈশিষ্ট্যের মহাদেশ' (Continent of Extremes) বলা হয় কারণ এই মহাদেশে ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, স্বাভাবিক উদ্ভিদ, জনসংখ্যা এবং সংস্কৃতির চরম বৈপরীত্য ও বৈচিত্র্য দেখা যায়।
- ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য: এশিয়াতে একদিকে যেমন পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান মাউন্ট এভারেস্ট (৮৮৪৮ মিটার) অবস্থিত, তেমনই অন্যদিকে পৃথিবীর নিম্নতম স্থলভাগ মরুসাগর (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মিটার নীচে) রয়েছে। এখানে পৃথিবীর ছাদ পামীর মালভূমির মতো উচ্চ মালভূমি, আবার সাইবেরিয়ার মতো সুবিশাল সমভূমিও দেখা যায়।
- জলবায়ুর বৈচিত্র্য: এই মহাদেশে পৃথিবীর প্রায় সব ধরনের জলবায়ু দেখা যায়। একদিকে যেমন ভারতের মৌসিনরামে পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত হয়, তেমনই আরবের মরুভূমিতে প্রায় বৃষ্টিই হয় না। আবার সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলে সারাবছর হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রা থাকে।
- স্বাভাবিক উদ্ভিদের বৈচিত্র্য: জলবায়ুর বৈচিত্র্যের কারণে এখানে নিরক্ষীয় অঞ্চলের চিরসবুজ অরণ্য থেকে শুরু করে মরু অঞ্চলের কাঁটাঝোপ, সরলবর্গীয় তৈগা বনভূমি এবং তুন্দ্রা অঞ্চলের মস-লাইকেন—সবই দেখতে পাওয়া যায়।
- জনসংখ্যার বৈষম্য: এশিয়া পৃথিবীর সর্বাধিক জনবহুল মহাদেশ। চিন ও ভারতের মতো দেশগুলিতে জনসংখ্যার ঘনত্ব যেমন খুব বেশি, তেমনই সাইবেরিয়া বা মরু অঞ্চলের মতো জায়গায় জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে।
এই সমস্ত চরম বৈপরীত্যের জন্যই এশিয়াকে 'চরম বৈশিষ্ট্যের মহাদেশ' বলা হয়।
এশিয়ার মধ্যভাগের পার্বত্য অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি বর্ণনা করো।
এশিয়ার ভূপ্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর মধ্যভাগে অবস্থিত বিশাল পার্বত্য অঞ্চল। এই অঞ্চলটি পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর থেকে পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত।
- পর্বত গ্রন্থি: এই পার্বত্য অঞ্চলের центре রয়েছে দুটি প্রধান পর্বত গ্রন্থি—পামীর গ্রন্থি এবং আর্মেনীয় গ্রন্থি। এই গ্রন্থিগুলি থেকে বিভিন্ন পর্বতশ্রেণি চারিদিকে প্রসারিত হয়েছে।
- পর্বতশ্রেণি: পামীর গ্রন্থি থেকে পূর্বে হিমালয়, কারাকোরাম, কুয়েনলুন, আলতিনতাগ এবং পশ্চিমে হিন্দুকুশ, সুলেমান পর্বতশ্রেণি বিস্তৃত হয়েছে। আর্মেনীয় গ্রন্থি থেকে পশ্চিমে পন্টিক ও টরাস এবং পূর্বে এলবুর্জ ও জাগ্রোস পর্বতশ্রেণি ছড়িয়ে পড়েছে।
- পর্বতবেষ্টিত মালভূমি: এই পর্বতশ্রেণিগুলির মাঝে অনেক উচ্চ মালভূমি গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো হিমালয় ও কুয়েনলুন পর্বতের মাঝে অবস্থিত পৃথিবীর সর্বোচ্চ মালভূমি তিব্বত। এছাড়া পন্টিক ও টরাসের মাঝে আনাতোলিয়া মালভূমি রয়েছে।
এই সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের গড় উচ্চতা ৪০০০ মিটারেরও বেশি, যা এই মহাদেশের জলবায়ু ও নদনদীকে ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
এশিয়া মহাদেশের নদনদীকে প্রবাহের দিক অনুযায়ী কয় ভাগে ভাগ করা যায়? প্রতিটি ভাগের বৈশিষ্ট্য ও দুটি করে উদাহরণ দাও।
প্রবাহের দিক অনুযায়ী এশিয়ার নদনদীকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. উত্তরবাহিনী নদী: এই নদীগুলি মধ্যভাগের পার্বত্য অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তরে সুমেরু মহাসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
বৈশিষ্ট্য: (i) নদীগুলির মোহনা বছরের ৮-৯ মাস বরফে ঢাকা থাকে। (ii) বসন্তকালে উজানে বরফ গলে যাওয়ায় এবং মোহনা বরফমুক্ত না হওয়ায় প্রায়ই বন্যা হয়।
উদাহরণ: ওব, ইনিসি, লেনা।২. দক্ষিণবাহিনী নদী: এই নদীগুলিও মধ্যভাগের উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণে ভারত মহাসাগরে পড়েছে।
বৈশিষ্ট্য: (i) নদীগুলি বরফগলা জল ও বৃষ্টির জলে পুষ্ট হওয়ায় চিরপ্রবাহী। (ii) অববাহিকা অঞ্চলগুলি অত্যন্ত উর্বর ও ঘনবসতিপূর্ণ।
উদাহরণ: গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, টাইগ্রিস।৩. পূর্ববাহিনী নদী: এই নদীগুলি মধ্যভাগের মালভূমি ও পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরে পতিত হয়েছে।
বৈশিষ্ট্য: (i) এই নদীগুলিও ঘনবসতিপূর্ণ এবং কৃষি ও শিল্পে উন্নত অঞ্চল তৈরি করেছে। (ii) নিম্নপ্রবাহে পলি সঞ্চয় করে উর্বর সমভূমি ও ব-দ্বীপ গঠন করেছে।
উদাহরণ: ইয়াংসিকিয়াং, হোয়াং-হো, আমুর।এশিয়া মহাদেশের জলবায়ুর বৈচিত্র্যের কারণগুলি আলোচনা করো।
এশিয়া মহাদেশে পৃথিবীর প্রায় সব ধরনের জলবায়ু দেখা যায়। এই বৈচিত্র্যের প্রধান কারণগুলি হলো:
- অক্ষാംশগত বিস্তার: এই মহাদেশ দক্ষিণে নিরক্ষরেখার কাছ থেকে উত্তরে সুমেরুবৃত্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে সূর্যরশ্মির পতনকোণের ব্যাপক তারতম্য ঘটে, যা তাপমাত্রার পার্থক্য তৈরি করে এবং বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলের সৃষ্টি করে।
- সমুদ্র থেকে দূরত্ব: মহাদেশের মধ্যভাগের অঞ্চলগুলি সমুদ্র থেকে বহু দূরে অবস্থিত। তাই এখানকার জলবায়ু চরমভাবাপন্ন (গ্রীষ্মে খুব গরম ও শীতে খুব ঠান্ডা)। অন্যদিকে, উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে সমুদ্রের প্রভাবে সমভাবাপন্ন জলবায়ু দেখা যায়।
- ভূপ্রকৃতির প্রভাব: মধ্যভাগের বিশাল পার্বত্য অঞ্চল জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাসকে বাধা দিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায় (যেমন মৌসুমি বায়ু হিমালয়ে বাধা পেয়ে ভারতে বৃষ্টিপাত ঘটায়) এবং শৈত্যপ্রবাহকে আটকে দেয়। আবার, উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় পার্বত্য অঞ্চলে শীতল জলবায়ু বিরাজ করে।
- বায়ুপ্রবাহ: শীত ও গ্রীষ্মে মৌসুমি বায়ুর বিপরীতমুখী প্রবাহ এশিয়ার জলবায়ুকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া, সাইবেরিয়ার শীতল বায়ু এবং পশ্চিমা বায়ুও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে।
ইয়াংসিকিয়াং নদী অববাহিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণগুলি কী কী?
চিনের ইয়াংসিকিয়াং নদী অববাহিকা এশিয়ার একটি অন্যতম উন্নত ও সমৃদ্ধশালী অঞ্চল। এর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণগুলি হলো:
- কৃষির উন্নতি: এই অববাহিকার বিস্তীর্ণ সমভূমি নবীন পলি দ্বারা গঠিত হওয়ায় অত্যন্ত উর্বর। অনুকূল জলবায়ু ও পর্যাপ্ত জলসম্পদের কারণে এখানে ধান, গম, কার্পাস, আখ, তৈলবীজ ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। হুনান প্রদেশকে 'চিনের ধানের গোলা' বলা হয়।
- খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য: অববাহিকাটি কয়লা, আকরিক লোহা, তামা, টাংস্টেনের মতো খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ, যা শিল্প স্থাপনে সহায়তা করেছে।
- শিল্পের উন্নতি: খনিজ সম্পদ, কৃষিভিত্তিক কাঁচামাল, সুলভ শ্রমিক ও উন্নত পরিকাঠামোর উপর ভিত্তি করে এখানে লৌহ-ইস্পাত, বস্ত্রবয়ন, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি নির্মাণ শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। সাংহাই চিনের বৃহত্তম শিল্পকেন্দ্র।
- উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা: এই অঞ্চলে সড়কপথ, রেলপথ ও জলপথের উন্নত জালিকা রয়েছে। ইয়াংসিকিয়াং নদী এবং সাংহাই, নানকিং, চুংকিং-এর মতো বন্দরগুলি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- জনসম্পদ: ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এখানে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুলভ ও দক্ষ শ্রমিক সহজেই পাওয়া যায়।
টোকিও-ইয়োকোহামা শিল্পাঞ্চলের (কিহিন শিল্পাঞ্চল) উন্নতির কারণগুলি লেখো।
জাপানের টোকিও-ইয়োকোহামা শিল্পাঞ্চল (কিহিন শিল্পাঞ্চল) পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর উন্নতির কারণগুলি হলো:
- উন্নত বন্দর: টোকিও এবং জাপানের বৃহত্তম বন্দর ইয়োকোহামার অবস্থান এই অঞ্চলের শিল্পোন্নতির প্রধান কারণ। এই বন্দরগুলির মাধ্যমে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত শিল্পদ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
- সমতলভূমির অবস্থান: হনসু দ্বীপের কান্টো সমভূমিতে অবস্থিত হওয়ায় এখানে শিল্পকেন্দ্র এবং পরিকাঠামো নির্মাণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
- দক্ষ ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত শ্রমিক: জাপানের শ্রমিকরা অত্যন্ত দক্ষ, পরিশ্রমী এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানে সমৃদ্ধ, যা শিল্পের বিকাশে সহায়ক হয়েছে।
- উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা: এই অঞ্চলে দ্রুতগামী বুলেট ট্রেন, সড়কপথ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার জাল রয়েছে।
- চাহিদা ও মূলধন: দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে শিল্পজাত দ্রব্যের ব্যাপক চাহিদা এবং পর্যাপ্ত মূলধনের যোগান শিল্পোন্নতিতে সাহায্য করেছে।
- সরকারি নীতি: জাপান সরকারের শিল্পবান্ধব নীতি এই অঞ্চলের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার খনিজ তেল উত্তোলক অঞ্চল সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া খনিজ তেল উত্তোলনে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে।
- সঞ্চয় ও উত্তোলন: পৃথিবীর মোট সঞ্চিত খনিজ তেলের প্রায় ৬০ শতাংশই এই অঞ্চলে রয়েছে এবং বিশ্বের মোট উত্তোলনের প্রায় ৩০ শতাংশ এখান থেকেই হয়।
- প্রধান দেশসমূহ: এই অঞ্চলের প্রধান খনিজ তেল উত্তোলনকারী দেশগুলি হলো সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার ইত্যাদি। এর মধ্যে সৌদি আরব এককভাবে পৃথিবীর বৃহত্তম তেল উৎপাদক এবং এখানে বিশ্বের ২৬ শতাংশ তেল সঞ্চিত আছে।
- গুরুত্ব: আধুনিক যন্ত্রনির্ভর সভ্যতা খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীল। যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানা এবং প্লাস্টিক, রং, কৃত্রিম তন্তুর মতো পেট্রোরসায়ন শিল্পে খনিজ তেল অপরিহার্য।
- OPEC-এর ভূমিকা: এই অঞ্চলের দেশগুলি OPEC (খনিজ তেল রপ্তানিকারক দেশগুলির সংগঠন) -এর সদস্য। এই সংগঠনটি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে।
- অর্থনীতি: খনিজ তেল রপ্তানিই এই দেশগুলির অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থে এখানকার মানুষ উন্নত ও বিলাসবহুল জীবনযাপন করে।
টিকা লেখো: (ক) তৈগা অরণ্য (খ) ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু
(ক) তৈগা অরণ্য:
রাশিয়ার সাইবেরিয়া জুড়ে বিস্তৃত পৃথিবীর বৃহত্তম সরলবর্গীয় বৃক্ষের বনভূমি তৈগা নামে পরিচিত। এটি সাইবেরীয় জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত। এখানকার বৈশিষ্ট্য হলো অতি শীতল ও দীর্ঘস্থায়ী শীতকাল এবং স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্মকাল। এই জলবায়ুতে পাইন, ফার, স্প্রুস, লার্চ, বার্চের মতো গাছ জন্মায়। বরফ পড়ার জন্য গাছগুলির আকৃতি শঙ্কুর মতো এবং পাতাগুলি ছুঁচালো হয়।
(খ) ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু:
এশিয়া মহাদেশের ভূমধ্যসাগরের তীরে সিরিয়া, লেবানন, তুরস্ক, ইজরায়েল প্রভৃতি দেশে এই জলবায়ু দেখা যায়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এখানে পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে শীতকালে বৃষ্টিপাত হয় এবং গ্রীষ্মকাল শুষ্ক থাকে। গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা ২১°-২৭° সে. এবং শীতকালীন গড় তাপমাত্রা ৫°-১০° সে.। এখানে জলপাই, আঙুর, লেবুর মতো ফলের গাছ এবং কর্ক, ওক, লরেলের মতো গাছ জন্মায়।
এশিয়া মহাদেশের উত্তরে অবস্থিত বিশাল সমভূমির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
এশিয়ার মধ্যভাগের পার্বত্য অঞ্চলের উত্তরে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম সমভূমিটি তিনটি অংশে বিভক্ত:
- তুরানের নিম্নভূমি: উত্তরের সমভূমির দক্ষিণ-পশ্চিমে কাস্পিয়ান ও আরল সাগরের চারপাশে এই নিম্নভূমি অবস্থিত।
- সাইবেরিয়ার সমভূমি: এটি এশিয়ার উত্তরে ওব, ইনিসি ও লেনা নদীর পলি সঞ্চয় এবং হিমবাহের কাজের ফলে গঠিত হয়েছে। নদীগুলির মোহনা দীর্ঘ সময় বরফাবৃত থাকায় এখানে প্রায়ই বন্যা হয় এবং বহু জলাভূমি দেখা যায়।
- পূর্বের উচ্চভূমি বা শিল্ড সমভূমি: এই সমভূমির উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত প্রাচীন মালভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে এই শিল্ড সমভূমি তৈরি হয়েছে।
এই সমগ্র সমভূমিটি দক্ষিণ-পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে সামান্য ঢালু।
টিকা লেখো: (ক) ইয়োকোহামা (খ) ঘাওয়ার
(ক) ইয়োকোহামা:
ইয়োকোহামা জাপানের হনসু দ্বীপে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং দেশের সর্ববৃহৎ বন্দর। এটি টোকিও থেকে প্রায় ৩০ কিমি দূরে অবস্থিত। টোকিও বন্দরের গভীরতা কম হওয়ায় বড় জাহাজ সেখানে প্রবেশ করতে পারে না, তাই ইয়োকোহামা জাপানের প্রধান বহির্বন্দর হিসেবে কাজ করে। এটি টোকিও-ইয়োকোহামা শিল্পাঞ্চলের একটি প্রধান কেন্দ্র এবং শিল্প ও বাণিজ্যে অত্যন্ত উন্নত। এই শহরটি পরিবেশ-বান্ধব নগর পরিকল্পনার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
(খ) ঘাওয়ার:
ঘাওয়ার সৌদি আরবে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম খনিজ তেল উত্তোলন কেন্দ্র। এটি আরব উপদ্বীপের পূর্বাংশে পারস্য উপসাগরের কাছে অবস্থিত। এই তৈলক্ষেত্রটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রচলিত তৈলক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত এবং সৌদি আরবের তেল উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ এখান থেকেই উত্তোলিত হয়। এটি দেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।