অধ্যায় ১.৩: চুম্বক (Magnet)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা চুম্বক ও তার বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানব। চুম্বক লোহা, নিকেল, কোবাল্টের মতো চৌম্বক পদার্থকে আকর্ষণ করে। চুম্বকের দুটি প্রধান ধর্ম হল আকর্ষণ ধর্ম এবং দিকনির্দেশক ধর্ম। একটি চুম্বককে অবাধে ঝুলিয়ে দিলে তা সর্বদা উত্তর-দক্ষিণ দিকে মুখ করে স্থির থাকে। চুম্বকের দুটি মেরু থাকে—উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু। সমমেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীত মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। একটি শক্তিশালী চুম্বকের প্রভাবে চৌম্বক পদার্থও সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত হতে পারে, যাকে চৌম্বক আবেশ বলে। তড়িৎ প্রবাহের মাধ্যমেও চুম্বক তৈরি করা যায়, যা তড়িৎ-চুম্বক নামে পরিচিত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নৌকম্পাস, কলিংবেল, কম্পিউটার হার্ডডিস্ক, এটিএম কার্ড ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে চুম্বকের ব্যবহার রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
নিচের কোনটি চৌম্বক পদার্থ?
উত্তর: (গ) লোহা
নিচের কোনটি অচৌম্বক পদার্থ?
উত্তর: (ঘ) কাগজ
প্রাকৃতিক চুম্বক হল—
উত্তর: (গ) ম্যাগনেটাইট
একটি চুম্বককে অবাধে ঝুলিয়ে দিলে সেটি কোন দিকে মুখ করে স্থির থাকে?
উত্তর: (খ) উত্তর-দক্ষিণ
চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি কোথায়?
উত্তর: (খ) দুই মেরুতে
চুম্বকের উদাসীন অঞ্চল কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: (ঘ) ঠিক মাঝখানে
চুম্বকের সমমেরু পরস্পরকে—
উত্তর: (খ) বিকর্ষণ করে
চুম্বকের বিপরীত মেরু পরস্পরকে—
উত্তর: (ক) আকর্ষণ করে
চুম্বকত্ব প্রমাণের শ্রেষ্ঠ উপায় হল—
উত্তর: (খ) বিকর্ষণ
চুম্বকের প্রভাবে কোনো চৌম্বক পদার্থে চুম্বকত্ব সৃষ্টির ঘটনাকে বলে—
উত্তর: (খ) চৌম্বক আবেশ
আকর্ষণের পূর্বে কী হয়?
উত্তর: (খ) আবেশ
একটি চুম্বককে টুকরো টুকরো করলে প্রতিটি টুকরোয়—
উত্তর: (গ) উত্তর ও দক্ষিণ উভয় মেরুই থাকে
নিচের কোনটিতে তড়িৎ-চুম্বক ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: (গ) ইলেকট্রিক কলিংবেল
চৌম্বক দৈর্ঘ্য, জ্যামিতিক দৈর্ঘ্যের প্রায়—
উত্তর: (গ) 0.86 গুণ
পৃথিবী নিজেই একটি বিরাট—
উত্তর: (খ) চুম্বক
চুম্বক শলাকা হল একটি—
উত্তর: (গ) হালকা ও ক্ষুদ্র চুম্বক
কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে ব্যবহৃত হয়—
উত্তর: (গ) চুম্বকিত পদার্থের আস্তরণ
চুম্বকের মেরু দুটিকে যোগকারী সরলরেখাকে বলে—
উত্তর: (খ) চৌম্বক অক্ষ
চুম্বকের উত্তর সন্ধানী মেরুকে সংক্ষেপে বলে—
উত্তর: (ক) উত্তর মেরু (N)
নিচের কোনটির উপর তাপের প্রভাব পড়লে চুম্বকত্ব নষ্ট হয়ে যায়?
উত্তর: (গ) চুম্বক
পরিযায়ী পাখিরা দিক নির্ণয় করে কিসের সাহায্যে?
উত্তর: (গ) পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র
তড়িৎ প্রবাহের ফলে চুম্বকত্ব সৃষ্টির ঘটনাকে বলে—
উত্তর: (গ) তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বক ফল
নৌকম্পাসে কী ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: (খ) চুম্বক শলাকা
একটি একক চৌম্বক মেরুর—
উত্তর: (খ) অস্তিত্ব নেই
চুম্বকের চারপাশে যে অঞ্চল জুড়ে তার প্রভাব বজায় থাকে, তাকে বলে—
উত্তর: (গ) চৌম্বক ক্ষেত্র
তড়িৎ চুম্বক তৈরি করতে প্রয়োজন—
উত্তর: (ক) কাঁচা লোহা ও তামার তার
একটি স্থায়ী চুম্বক তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়—
উত্তর: (খ) ইস্পাত
পৃথিবীর ভৌগোলিক উত্তর মেরুর কাছে পৃথিবীর চুম্বকের কোন মেরু থাকে?
উত্তর: (খ) দক্ষিণ মেরু
চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয় না কোনটি?
উত্তর: (ঘ) তামার মুদ্রা
কোন প্রাণীর মস্তিষ্কে ম্যাগনেটাইট নামক চৌম্বকীয় বস্তু পাওয়া যায়?
উত্তর: (গ) পায়রা
চুম্বকের শক্তি বৃদ্ধি করা যায়—
উত্তর: (গ) তড়িৎ প্রবাহ পাঠিয়ে
এটিএম কার্ডের কালো স্ট্রিপটিতে কী থাকে?
উত্তর: (খ) চৌম্বকীয় পদার্থের আস্তরণ
মেরুজ্যোতি সৃষ্টির কারণ—
উত্তর: (খ) ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্র ও মহাজাগতিক রশ্মির ক্রিয়া
চৌম্বক পদার্থের উদাহরণ হল—
উত্তর: (গ) কোবাল্ট
একটি দণ্ড চুম্বকের মেরু সংখ্যা—
উত্তর: (খ) দুটি
চুম্বক কোন পদার্থকে আকর্ষণ করে?
উত্তর: (ক) চৌম্বক পদার্থ
স্থায়ী চুম্বক ও তড়িৎ চুম্বকের মধ্যে কোনটি বেশি শক্তিশালী হতে পারে?
উত্তর: (খ) তড়িৎ চুম্বক
কোনো চুম্বককে বারবার আঘাত করলে তার চুম্বকত্ব—
উত্তর: (খ) কমে
চুম্বকের ইংরেজি নাম Magnet হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: (খ) ম্যাগনেসিয়া অঞ্চলে পাওয়া যেত বলে
তড়িৎ চুম্বকের শক্তি নির্ভর করে—
উত্তর: (গ) উভয়টির উপর
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
চুম্বক কাকে বলে?
উত্তর: যে বস্তুর আকর্ষণ ধর্ম (লোহা, নিকেল, কোবাল্ট ইত্যাদি বস্তুকে আকর্ষণ করে) এবং দিকনির্দেশক ধর্ম (অবাধে ঝুলিয়ে দিলে উত্তর-দক্ষিণ দিকে মুখ করে থাকে) আছে, তাকে চুম্বক বলে।
চৌম্বক ও অচৌম্বক পদার্থ কাকে বলে?
উত্তর: যে সব পদার্থকে চুম্বক আকর্ষণ করে, তাদের চৌম্বক পদার্থ (যেমন: লোহা, নিকেল) বলে। আর যে সব পদার্থকে চুম্বক আকর্ষণ করে না, তাদের অচৌম্বক পদার্থ (যেমন: কাঠ, প্লাস্টিক) বলে।
প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম চুম্বক কাকে বলে?
উত্তর: প্রকৃতিতে প্রাপ্ত চুম্বককে (যেমন: ম্যাগনেটাইট) প্রাকৃতিক চুম্বক বলে। আর চৌম্বক পদার্থকে বিশেষ উপায়ে চুম্বকে পরিণত করে যে চুম্বক তৈরি করা হয়, তাকে কৃত্রিম চুম্বক বলে।
* চুম্বকের দিকনির্দেশক ধর্ম কী?
উত্তর: একটি চুম্বককে অবাধে অনুভূমিক তলে ঘুরতে দেওয়ার জন্য ঝুলিয়ে বা ভাসিয়ে রাখলে, সেটি সর্বদা পৃথিবীর ভৌগোলিক উত্তর-দক্ষিণ দিক বরাবর মুখ করে স্থির থাকে। চুম্বকের এই ধর্মকেই দিকনির্দেশক ধর্ম বলে।
চুম্বকের মেরু কাকে বলে?
উত্তর: একটি চুম্বকের দুই প্রান্তে যে দুটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে তার আকর্ষণ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে, সেই অঞ্চল দুটিকে চুম্বকের মেরু বলে।
উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু কাকে বলে?
উত্তর: অবাধে ঝুলন্ত চুম্বকের যে মেরুটি পৃথিবীর ভৌগোলিক উত্তর দিকে মুখ করে থাকে, তাকে উত্তর সন্ধানী মেরু বা উত্তর মেরু (N) এবং যে মেরুটি দক্ষিণ দিকে মুখ করে থাকে, তাকে দক্ষিণ সন্ধানী মেরু বা দক্ষিণ মেরু (S) বলে।
চুম্বকের উদাসীন অঞ্চল কী?
উত্তর: চুম্বকের ঠিক মাঝখানে যে অঞ্চলে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ ক্ষমতা প্রায় থাকে না, সেই অঞ্চলকে উদাসীন অঞ্চল বলে।
চৌম্বক অক্ষ ও চৌম্বক দৈর্ঘ্য কাকে বলে?
উত্তর: চুম্বকের উত্তর ও দক্ষিণ মেরু সংযোগকারী কাল্পনিক সরলরেখাকে চৌম্বক অক্ষ বলে। আর মেরু দুটির মধ্যবর্তী দূরত্বকে চৌম্বক দৈর্ঘ্য বলে।
চুম্বকের সমমেরু ও বিপরীত মেরুর মধ্যে ক্রিয়া কেমন হয়?
উত্তর: চুম্বকের সমমেরু (N-N বা S-S) পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীত মেরু (N-S) পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
বিকর্ষণই চুম্বকত্ব প্রমাণের শ্রেষ্ঠ উপায় কেন?
উত্তর: কারণ একটি চুম্বক একটি চৌম্বক পদার্থকে (যেমন লোহা) আকর্ষণ করতে পারে, আবার অন্য একটি চুম্বকের বিপরীত মেরুকেও আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু একটি চুম্বক শুধুমাত্র অন্য একটি চুম্বকের সমমেরুকেই বিকর্ষণ করতে পারে, কোনো চৌম্বক পদার্থকে পারে না। তাই বিকর্ষণ দ্বারাই নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় বস্তুটি চুম্বক কি না।
* চৌম্বক আবেশ কাকে বলে?
উত্তর: একটি শক্তিশালী চুম্বকের উপস্থিতিতে কোনো চৌম্বক পদার্থ সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে চৌম্বক আবেশ বলে।
'আকর্ষণের পূর্বে আবেশ হয়'—কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: এর অর্থ হলো, একটি চুম্বক কোনো চৌম্বক পদার্থকে আকর্ষণ করার আগে চৌম্বক আবেশের মাধ্যমে ওই পদার্থটিকে প্রথমে একটি অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত করে এবং তারপর তার বিপরীত মেরুকে আকর্ষণ করে।
একক চৌম্বক মেরুর অস্তিত্ব নেই কেন?
উত্তর: একটি চুম্বককে যতবারই ভাঙা হোক না কেন, প্রতিটি খণ্ডেই দুটি বিপরীত মেরুর (উত্তর ও দক্ষিণ) সৃষ্টি হয়। আলাদাভাবে শুধু উত্তর বা শুধু দক্ষিণ মেরুবিশিষ্ট চুম্বকের খণ্ড পাওয়া সম্ভব নয়। তাই একক চৌম্বক মেরুর অস্তিত্ব নেই।
চৌম্বক ক্ষেত্র কাকে বলে?
উত্তর: একটি চুম্বকের চারপাশে যে অঞ্চল জুড়ে তার আকর্ষণ বা বিকর্ষণ ধর্ম কাজ করে, সেই অঞ্চলটিকে ওই চুম্বকের চৌম্বক ক্ষেত্র বলে।
তড়িৎ-চুম্বক কাকে বলে?
উত্তর: কোনো কাঁচা লোহার দণ্ডের উপর অন্তরিত তামার তার জড়িয়ে তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে দণ্ডটি সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত হয়। এই ধরনের চুম্বককে তড়িৎ-চুম্বক বলে।
তড়িৎ-চুম্বকের একটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করার সাথে সাথেই তড়িৎ-চুম্বকের চুম্বকত্ব প্রায় লোপ পায়।
চুম্বকের দুটি ব্যবহার লেখো।
উত্তর: চুম্বকের দুটি ব্যবহার হলো: (১) দিক নির্ণয়ের জন্য নৌকম্পাসে ব্যবহার করা হয়। (২) ইলেকট্রিক কলিংবেল ও লাউডস্পিকারে ব্যবহৃত হয়।
পৃথিবী যে একটি চুম্বক, তার একটি প্রমাণ দাও।
উত্তর: একটি লোহার দণ্ডকে বহুদিন ধরে পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ দিক বরাবর রেখে দিলে দেখা যায় দণ্ডটির মধ্যে ক্ষীণ চুম্বকত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে পৃথিবী নিজেই একটি চুম্বক।
চুম্বক শলাকা কী?
উত্তর: চুম্বক শলাকা হলো একটি হালকা, ক্ষুদ্র, সূঁচালো প্রান্তযুক্ত চুম্বক যা একটি আলম্বের উপর অবাধে ঘুরতে পারে এবং দিক নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
চৌম্বক দৈর্ঘ্য ও জ্যামিতিক দৈর্ঘ্যের মধ্যে সম্পর্ক কী?
উত্তর: কোনো দণ্ড চুম্বকের চৌম্বক দৈর্ঘ্য তার জ্যামিতিক দৈর্ঘ্যের প্রায় 0.86 গুণ হয়।
কী কী করলে চুম্বকের চুম্বকত্ব নষ্ট হয়ে যায়?
উত্তর: চুম্বককে বারবার আঘাত করলে, আগুনে উত্তপ্ত করলে বা দুটি চুম্বকের সমমেরু দীর্ঘক্ষণ কাছাকাছি রাখলে চুম্বকত্ব নষ্ট হয়ে যায়।
মেরুজ্যোতি কী?
উত্তর: মহাজাগতিক রশ্মির তড়িৎযুক্ত কণাগুলি যখন পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তখন ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রিয়ার ফলে মেরু অঞ্চলে যে উজ্জ্বল আলোর ছটা দেখা যায়, তাকে মেরুজ্যোতি বা অরোরা বলে।
চুম্বকের আবেশী মেরু ও আবিষ্ট মেরু বলতে কী বোঝ?
উত্তর: চৌম্বক আবেশের ক্ষেত্রে, যে চুম্বকটির প্রভাবে আবেশ ঘটে তার মেরুকে আবেশী মেরু বলে। আর চৌম্বক পদার্থটির যে প্রান্তে বিপরীত মেরুর সৃষ্টি হয়, তাকে আবিষ্ট মেরু বলে।
সাইকেলের ডায়নামোতে চুম্বকের কী ভূমিকা?
উত্তর: সাইকেলের ডায়নামোতে একটি চুম্বক ও তারের কুণ্ডলী থাকে। চাকা ঘুরলে চুম্বকটি ঘোরে, ফলে কুণ্ডলীতে তড়িৎ প্রবাহ আবিষ্ট হয় যা সাইকেলের আলো জ্বালায়।
স্থায়ী চুম্বক ও অস্থায়ী চুম্বকের পার্থক্য কী?
উত্তর: যে চুম্বকের চুম্বকত্ব সহজে নষ্ট হয় না, তাকে স্থায়ী চুম্বক (যেমন: দণ্ড চুম্বক) বলে। আর যে চুম্বকের চুম্বকত্ব সাময়িক, তাকে অস্থায়ী চুম্বক (যেমন: তড়িৎ চুম্বক) বলে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* চুম্বকের ধর্মগুলি তালিকাভুক্ত করো। বিকর্ষণই যে চুম্বকত্ব প্রমাণের শ্রেষ্ঠ উপায়—তা একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
চুম্বকের প্রধান ধর্মগুলি হলো:
১. আকর্ষণ ধর্ম: চুম্বক লোহা, নিকেল, কোবাল্ট ইত্যাদি চৌম্বক পদার্থকে আকর্ষণ করে।
২. দিকনির্দেশক ধর্ম: চুম্বককে অবাধে ঝুলিয়ে দিলে তা সর্বদা উত্তর-দক্ষিণ দিকে মুখ করে স্থির থাকে।
৩. মেরুর অস্তিত্ব: প্রতিটি চুম্বকের দুটি বিপরীত মেরু (উত্তর ও দক্ষিণ) থাকে এবং একক মেরুর অস্তিত্ব নেই।
৪. মেরুর পারস্পরিক ক্রিয়া: সমমেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীত মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
৫. চৌম্বক আবেশ: চুম্বকের প্রভাবে কোনো চৌম্বক পদার্থ সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত হতে পারে।
বিকর্ষণই চুম্বকত্ব প্রমাণের শ্রেষ্ঠ উপায়:
একটি পদার্থ চুম্বক না চৌম্বক পদার্থ, তা নিশ্চিতভাবে বোঝার জন্য বিকর্ষণই শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। কারণ—
একটি চুম্বক অপর একটি চুম্বকের বিপরীত মেরুকে যেমন আকর্ষণ করে, তেমনই একটি চৌম্বক পদার্থকেও (যেমন লোহা) আকর্ষণ করে। সুতরাং, দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে দুটি বস্তুই চুম্বক।
কিন্তু, একটি চুম্বক কেবলমাত্র অন্য একটি চুম্বকের সমমেরুকেই বিকর্ষণ করতে পারে। কোনো চৌম্বক পদার্থকে বিকর্ষণ করতে পারে না।
উদাহরণস্বরূপ, একটি দণ্ড চুম্বকের কাছে একটি লোহার দণ্ড আনলে সর্বদা আকর্ষণ হবে। কিন্তু যদি অন্য একটি দণ্ড চুম্বক আনা হয়, তবে এক প্রান্তের কাছে আনলে আকর্ষণ এবং অন্য প্রান্তের কাছে আনলে বিকর্ষণ হবে। এই বিকর্ষণ ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে দ্বিতীয় দণ্ডটিও একটি চুম্বক।চৌম্বক আবেশ কাকে বলে? একটি পরীক্ষার সাহায্যে দেখাও যে 'আকর্ষণের পূর্বে আবেশ হয়'।
উত্তর:
চৌম্বক আবেশ: একটি শক্তিশালী চুম্বকের উপস্থিতিতে কোনো চৌম্বক পদার্থ (যেমন: লোহা, ইস্পাত) সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে চৌম্বক আবেশ বলে।
'আকর্ষণের পূর্বে আবেশ হয়'—তার পরীক্ষা:
একটি শক্তিশালী দণ্ড চুম্বকের উত্তর মেরুর নিচে একটি লোহার পেরেক ধরলে, পেরেকটি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে আটকে থাকে। এখন, এই প্রথম পেরেকের নিচে যদি দ্বিতীয় একটি পেরেক ধরা হয়, দেখা যাবে প্রথম পেরেকটি দ্বিতীয় পেরেকটিকে আকর্ষণ করছে। এইভাবে পরপর কয়েকটি পেরেকের একটি শিকল তৈরি করা যায়।
এখানে, দণ্ড চুম্বকের প্রভাবে প্রথম পেরেকটি আবিষ্ট হয়ে একটি অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত হয়েছে। এর যে প্রান্তটি চুম্বকের উত্তর মেরুর সংস্পর্শে আছে সেখানে দক্ষিণ মেরু এবং দূরবর্তী প্রান্তে উত্তর মেরু আবিষ্ট হয়েছে। এই আবিষ্ট উত্তর মেরুটি আবার দ্বিতীয় পেরেকে আবেশ ঘটিয়ে তার নিকট প্রান্তে দক্ষিণ মেরু সৃষ্টি করে এবং তাকে আকর্ষণ করে।
এখন যদি মূল দণ্ড চুম্বকটি সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে পেরেকগুলির চুম্বকত্ব নষ্ট হয়ে যায় এবং তারা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যায়।
এই পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয় যে, চুম্বক প্রথমে চৌম্বক পদার্থকে আবেশের মাধ্যমে চুম্বকে পরিণত করে এবং তারপর তাকে আকর্ষণ করে। অর্থাৎ, আকর্ষণের পূর্বে আবেশ হয়।তড়িৎ-চুম্বক কী? এর গঠন ও কার্যনীতি একটি চিত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো। এর শক্তি কী কী বিষয়ের উপর নির্ভর করে?
উত্তর:
তড়িৎ-চুম্বক: একটি কাঁচা লোহার দণ্ডের উপর অন্তরিত (insulated) তামার তার জড়িয়ে কুণ্ডলী তৈরি করে তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে দণ্ডটি একটি শক্তিশালী চুম্বকে পরিণত হয়। এই ধরনের চুম্বককে তড়িৎ-চুম্বক বলে। তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করলে এর চুম্বকত্ব প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লোপ পায়।
গঠন ও কার্যনীতি:
একটি কাঁচা লোহার দণ্ডকে মজ্জা (core) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর উপর অন্তরিত তামার তার ঘন করে জড়িয়ে একটি সলিনয়েড বা কুণ্ডলী তৈরি করা হয়। তারের দুই প্রান্ত একটি ব্যাটারি ও সুইচের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সুইচ অন করে তড়িৎ প্রবাহ চালু করলে লোহার দণ্ডটি একটি শক্তিশালী চুম্বকে পরিণত হয় এবং চৌম্বক পদার্থকে আকর্ষণ করে। তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করলে এটি আবার সাধারণ লোহার দণ্ডে পরিণত হয়। প্রবাহের দিক পরিবর্তন করলে উৎপন্ন চুম্বকের মেরুও উল্টে যায়।
তড়িৎ-চুম্বকের শক্তি নির্ভর করে:
১. তড়িৎ প্রবাহমাত্রার উপর: কুণ্ডলীর মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের মাত্রা বাড়ালে চুম্বকের শক্তি বৃদ্ধি পায়।
২. পাকসংখ্যার উপর: কুণ্ডলীর পাকসংখ্যা বাড়ালেও চুম্বকের শক্তি বৃদ্ধি পায়।
৩. মজ্জার উপাদানের উপর: কাঁচা লোহা ব্যবহার করলে চুম্বকটি বেশি শক্তিশালী হয়।দৈনন্দিন জীবনে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে চুম্বকের চারটি ব্যবহার উল্লেখ করো। পৃথিবী নিজেই যে একটি বিরাট চুম্বক, তার স্বপক্ষে দুটি যুক্তি দাও।
উত্তর:
চুম্বকের চারটি ব্যবহার:
১. দিক নির্ণয়ে: প্রাচীনকাল থেকে নাবিকরা দিক নির্ণয়ের জন্য নৌকম্পাস ব্যবহার করেন, যার মূল উপাদান হলো একটি চুম্বক শলাকা।
২. বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে: ইলেকট্রিক কলিংবেল, লাউডস্পিকার, বৈদ্যুতিক মোটর, ডায়নামো ইত্যাদি যন্ত্রে স্থায়ী চুম্বক বা তড়িৎ-চুম্বক ব্যবহার করা হয়।
৩. তথ্য সংরক্ষণে: কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, অডিও-ভিডিও ক্যাসেটের ফিতা, এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডের ম্যাগনেটিক স্ট্রিপে চুম্বকীয় পদার্থের আস্তরণ ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়।
৪. চিকিৎসা ক্ষেত্রে: চোখের মধ্যে লোহার কণা ঢুকে গেলে তা বের করার জন্য ডাক্তাররা শক্তিশালী তড়িৎ-চুম্বক ব্যবহার করেন।
পৃথিবী একটি চুম্বক, তার স্বপক্ষে যুক্তি:
১. দিকনির্দেশক ধর্ম: একটি চুম্বককে অবাধে ঝুলিয়ে দিলে তা সর্বদা উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে থাকে। পৃথিবীর নিজস্ব একটি চৌম্বক ক্ষেত্র আছে বলেই এমনটা হয়। পৃথিবীর চৌম্বক দক্ষিণ মেরু এর ভৌগোলিক উত্তর মেরুর কাছে এবং চৌম্বক উত্তর মেরু ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরুর কাছে অবস্থিত।
২. ভূ-চৌম্বক আবেশ: একটি লোহার দণ্ডকে বহুদিন ধরে পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ দিক বরাবর রেখে দিলে দেখা যায়, দণ্ডটির মধ্যে চৌম্বক আবেশের ফলে ক্ষীণ চুম্বকত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে পৃথিবী একটি চুম্বকের মতো আচরণ করে।একটি দণ্ড চুম্বকের চৌম্বক ক্ষেত্র বলতে কী বোঝায়? একটি পরীক্ষার সাহায্যে কীভাবে একটি দণ্ড চুম্বকের উদাসীন অঞ্চল ও মেরু শনাক্ত করবে তা বর্ণনা করো।
উত্তর:
চৌম্বক ক্ষেত্র: একটি চুম্বকের চারপাশে যে অঞ্চল জুড়ে তার আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বলের প্রভাব অনুভূত হয়, সেই সমগ্র অঞ্চলটিকে ওই চুম্বকের চৌম্বক ক্ষেত্র বলে।
মেরু ও উদাসীন অঞ্চল শনাক্তকরণ পরীক্ষা:
উপকরণ: একটি দণ্ড চুম্বক, একটি সাদা কাগজ, বেশ কিছু লোহার গুঁড়ো।
পদ্ধতি:
১. একটি সাদা কাগজের উপর লোহার গুঁড়োগুলি সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।
২. এরপর দণ্ড চুম্বকটিকে ওই লোহার গুঁড়োর উপর রাখতে হবে।
৩. কিছুক্ষণ পর চুম্বকটিকে সাবধানে তুলে ধরতে হবে।
পর্যবেক্ষণ:
দেখা যাবে, চুম্বকের দুই প্রান্তীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে লোহার গুঁড়ো আটকে আছে এবং মাঝখানের অংশে প্রায় কোনো লোহার গুঁড়োই আটকে নেই।
সিদ্ধান্ত:
চুম্বকের যে দুটি অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি লোহার গুঁড়ো আটকে আছে, সেই অঞ্চল দুটি হলো চুম্বকের মেরু, কারণ এই অঞ্চলগুলিতে আকর্ষণ ক্ষমতা সর্বাধিক। আর চুম্বকের মাঝখানে যে অংশে প্রায় কোনো লোহার গুঁড়ো আটকে নেই, সেই অঞ্চলটি হলো চুম্বকের উদাসীন অঞ্চল, কারণ এখানে আকর্ষণ ক্ষমতা প্রায় শূন্য। এইভাবে চুম্বকের মেরু ও উদাসীন অঞ্চল শনাক্ত করা যায়।