অধ্যায় ৭: বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক আন্দোলন (Class 10 History Solutions)
WBBSE-র দশম শ্রেণীর ইতিহাস বইয়ের সপ্তম অধ্যায় 'বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক আন্দোলন'-এর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পভিত্তিক (MCQ), অতি সংক্ষিপ্ত (SAQ) এবং রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর এখানে Madhyamik পরীক্ষার সাল উল্লেখ করে আলোচনা করা হলো।
Madhyamik বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলী (MCQ)
-
'বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা' রচনা করেন Madhyamik 2025 (Sample) & 2023
-
'জয়শ্রী' পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন Madhyamik 2025 (Sample)
-
সূর্যসেন শহীদ হন Madhyamik 2025 (Sample)
-
ভারতছাড়ো আন্দোলনে (১৯৪২) ভোগেশ্বরী ফুকোননী শহীদ হয়েছিলেন Madhyamik 2024
-
অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির সম্পাদক ছিলেন Madhyamik 2024 & 2019
-
বীণা দাস বাংলার ছোটোলাট স্ট্যান্সী জ্যাকসনকে হত্যা করার চেষ্টা করেন Madhyamik 2024 & 2019
-
নারী কর্ম মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Madhyamik 2023 & 2018
-
এজাভা সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা ছিলেন Madhyamik 2023
-
'নারী সত্যাগ্রহ সমিতি' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল Madhyamik 2020
-
'মাস্টার-দা' নামে পরিচিত ছিলেন Madhyamik 2020 & 2019 (বহিরাগত)
-
মাদ্রাজে 'আত্মসম্মান আন্দোলন' শুরু করেন Madhyamik 2020
-
ভাইকম সত্যাগ্রহ অনুষ্ঠিত হয়েছিল Madhyamik 2019
-
সূর্যসেন প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী দলের নাম ছিল Madhyamik 2018
-
দলিতদের 'হরিজন' আখ্যা দিয়েছিলেন Madhyamik 2018
-
মাতঙ্গিনী হাজরা 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন যে স্থানে Madhyamik 2017
-
দীপালী সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Madhyamik 2017 & 2024 (বহিরাগত) & 2020 (বহিরাগত)
Madhyamik অতি সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্নাবলী (SAQ)
শুদ্ধ/অশুদ্ধ
-
কৃষ্ণকুমার মিত্র ছিলেন অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির সভাপতি। Madhyamik 2025 (Sample)
উত্তর: শু
-
অল ইন্ডিয়া সিডিউলড কাস্ট ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন বি. আর. আম্বেদকর। Madhyamik 2025 (Sample)
উত্তর: শু (১৯৪২ সালে)।
-
লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রতিষ্ঠা করেন বাসন্তী দেবী। Madhyamik 2020
উত্তর: অ (সঠিক উত্তর: সরলাদেবী চৌধুরানী)।
-
বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ছিলেন বাসন্তী দেবী। Madhyamik 2019
উত্তর: অ (তিনি ছিলেন অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের নেত্রী; বিপ্লবী আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত প্রমুখ)।
-
দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন কল্পনা দত্ত। Madhyamik 2019
উত্তর: অ (সঠিক উত্তর: লীলা নাগ)।
-
গান্ধিজি ও ড. আম্বেদকর যৌথভাবে দলিত আন্দোলন করেছিলেন। Madhyamik 2017
উত্তর: অ (তাঁদের মধ্যে দলিতদের অধিকার নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য (পুণা চুক্তি) ছিল)।
স্তম্ভ মেলাও
-
'ক' স্তম্ভ: (২.২.৪) কল্পনা দত্ত Madhyamik 2025 (Sample)
উত্তর: (৩) বিপ্লবী কার্যকলাপ
-
'ক' স্তম্ভ: (২.৩.৩) উষাবেন মেহতা Madhyamik 2023
উত্তর: (২) বোম্বাই (ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় গোপন রেডিও পরিচালনা)
-
'ক' স্তম্ভ: (২.৩.৪) ডঃ আম্বেদকর Madhyamik 2018
উত্তর: (২) পুণা চুক্তি (১৯৩২)
একটি বা দুটি শব্দে উত্তর
-
'অলিন্দ যুদ্ধ' বলতে কী বোঝায়? Madhyamik 2025 (Sample)
উত্তর: ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং (মহাকরণ)-এর অলিন্দে ঢুকে কারাবিভাগের অধিকর্তা সিম্পসনকে হত্যা করেন। এরপর ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে তাঁদের যে লડাই হয়, তা 'অলিন্দ যুদ্ধ' নামে পরিচিত।
-
কী উদ্দেশ্যে 'নারী কর্মমন্দির' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? Madhyamik 2025 (Sample)
উত্তর: ১৯২১ সালে (মতান্তরে ১৯২২) দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর উদ্যোগে 'নারী কর্মমন্দির' প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের স্বনির্ভর করে তোলা এবং চরকা ও খদ্দরের মাধ্যমে স্বদেশি ভাবধারা প্রচার করা।
-
কোন বছর নারী সত্যাগ্রহ সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়? Madhyamik 2024
উত্তর: ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে (আইন অমান্য আন্দোলনের সময়)।
-
জাতীয় আন্দোলনে সরলাদেবী চৌধুরাণীর কীরূপ ভূমিকা ছিল? Madhyamik 2024
উত্তর: সরলাদেবী চৌধুরানী বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের সময় 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' (১৯০৪) প্রতিষ্ঠা করে স্বদেশি দ্রব্যের প্রচার ঘটান এবং 'বীরাষ্টমী ব্রত' ও প্রতাপাদিত্য উৎসবের মাধ্যমে যুবকদের মধ্যে বিপ্লবী ভাবধারা সঞ্চার করেন।
-
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি'র কীরূপ ভূমিকা ছিল? Madhyamik 2024
উত্তর: মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি' (IRA) ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে এবং জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে এক অসমসাহসী যুদ্ধ পরিচালনা করে।
-
'গান্ধিবুড়ি' নামে কে পরিচিত ছিলেন? Madhyamik 2023
উত্তর: মাতঙ্গিনী হাজরা।
-
দীপালি সংঘ কেন প্রতিষ্ঠিত হয়? Madhyamik 2023 & 2018
উত্তর: ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে লীলা নাগ (রায়) ঢাকায় 'দীপালি সংঘ' প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নারীশিক্ষার প্রসার ঘটানো, নারীদের মধ্যে স্বনির্ভরতা ও বিপ্লবী ভাবধারা জাগিয়ে তোলা এবং তাদের শরীরচর্চা, লাঠিখেলা ও অস্ত্রচালনা শেখানো।
-
গুরুচাঁদ ঠাকুর স্মরণীয় কেন? Madhyamik 2023
উত্তর: গুরুচাঁদ ঠাকুর ছিলেন বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলনের প্রধান নেতা। তিনি তাঁর বাবা হরিচাঁদ ঠাকুরের 'মতুয়া মহাসংঘ'-এর মাধ্যমে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, শিক্ষা বিস্তার ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছিলেন।
-
১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই অক্টোবর বাংলার নারী সমাজ কেন অরন্ধন পালন করে? Madhyamik 2020
উত্তর: রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন (১৯০৫, ১৬ই অক্টোবর) বাংলার নারী সমাজ এই বিভাজনের প্রতিবাদে ও ঐক্যবদ্ধ বাংলার প্রতীক হিসাবে উপবাস রেখে 'অরন্ধন' পালন করেছিলেন।
-
ননীবালা দেবী স্মরণীয় কেন? Madhyamik 2020
উত্তর: ননীবালা দেবী ছিলেন বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের (যুগান্তর দল) একজন সদস্যা। তিনি বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়া, অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখা এবং মিথ্যা পরিচয়ে জেলে গিয়ে তথ্য আদান-প্রদান করতেন। তিনি ছিলেন প্রথম মহিলা রাজবন্দী, যিনি প্রেসিডেন্সি জেলে পুলিশের অত্যাচারে অনশন করেন।
-
উষা মেহতা কোন্ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? Madhyamik 2019
উত্তর: 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন (১৯৪২)। (তিনি এই সময় বোম্বাইতে গোপন 'কংগ্রেস রেডিও' পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন)।
-
মাতঙ্গিনী হাজরা স্মরণীয় কেন? Madhyamik 2019
উত্তর: মাতঙ্গিনী হাজরা ('গান্ধিবুড়ি') 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের সময় (১৯৪২) মেদিনীপুরের তমলুকে 'তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার' প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন। তিনি তমলুক থানা অভিযানের সময় পুলিশের গুলিতে 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি দিতে দিতে মৃত্যুবরণ করেন।
-
দলিত কাদের বলা হয়? Madhyamik 2019 & 2017
উত্তর: 'দলিত' শব্দের অর্থ 'পদদলিত' বা 'নিপীড়িত'। ভারতের বর্ণহিন্দু সমাজব্যবস্থায় অস্পৃশ্য এবং সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত শ্রেণিদের (যেমন - নমঃশূদ্র, মাহার, এজাভা) একত্রে 'দলিত' বলা হয়।
-
অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি কেন প্রতিষ্ঠিত হয়? Madhyamik 2018
উত্তর: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের (১৯০৫) সময় ব্রিটিশ সরকারের চিফ সেক্রেটারি কার্লাইল 'কার্লাইল সার্কুলার' জারি করে ছাত্রদের আন্দোলনে যোগদান নিষিদ্ধ করেন। এর প্রতিবাদে এবং আন্দোলনকারী বিতাড়িত ছাত্রদের বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য শচীন্দ্রপ্রসাদ বসুর সম্পাদনায় 'অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি' প্রতিষ্ঠিত হয়।
-
রশিদ আলি দিবস কেন পালিত হয়েছি? Madhyamik 2017 & 2024 (বহিরাগত) & 2023 (বহিরাগত) & 2019 (বহিরাগত)
উত্তর: আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রশিদ আলিকে ব্রিটিশ সরকার বিচারের নামে ৭ বছরের কারাদণ্ড দিলে, এর প্রতিবাদে ১৯৪৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ছাত্র ধর্মঘট ও ব্যাপক গণ-আন্দোলন শুরু হয়। এই দিনটিই 'রশিদ আলি দিবস' নামে পালিত হয়।
-
অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি কে প্রতিষ্ঠা করেন? Madhyamik 2017 (বহিরাগত)
উত্তর: শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু।
Madhyamik রচনাধর্মী প্রশ্নাবলী
-
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর ভূমিকা বিশ্লেষণ করো। বিংশ শতকের ভারতে নারী আন্দোলনে দীপালি সংঘের কিরূপ ভূমিকা ছিল? Madhyamik 2025 (Sample)
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ভূমিকা:
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
- ১. বিপ্লবী দলে যোগদান: তিনি 'দীপালি সংঘ'-এর মাধ্যমে বিপ্লবী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হন এবং পরে মাস্টারদা সূর্য সেনের 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি' (IRA)-তে যোগ দেন।
- ২. চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন: তিনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (১৯৩০) এবং জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে (১৯৩০) সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংসের দায়িত্বে ছিলেন।
- ৩. পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ: ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে প্রীতিলতার নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করেন। এই ক্লাবটির বাইরে লেখা ছিল 'Dogs and Indians not allowed'। সফল আক্রমণের পর, ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পরিবর্তে তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ নারী বিপ্লবীদের অসামান্য অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
দীপালি সংঘের ভূমিকা:
লীলা নাগ (রায়) প্রতিষ্ঠিত 'দীপালি সংঘ' (১৯২৩, ঢাকা) নারী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে:
- ১. নারী শিক্ষার প্রসার: এই সংঘের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানো। এই উদ্দেশ্যে 'দীপালি স্কুল' ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়।
- ২. স্বনির্ভরতা ও শরীরচর্চা: নারীদের স্বনির্ভর করে তোলার পাশাপাশি লাঠিখেলা, তলোয়ার চালানো, শরীরচর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের শারীরিকভাবে সক্ষম ও সাহসী করে তোলা হতো।
- ৩. বিপ্লবী কার্যকলাপের কেন্দ্র: দীপালি সংঘ পরবর্তীকালে বিপ্লবীদের (বিশেষত 'শ্রীসংঘ'-এর) আশ্রয়স্থল ও যোগাযোগের গোপন কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো বহু বিপ্লবী এই সংঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
-
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স (BV) দলের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো। Madhyamik 2024
বিশ শতকের বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে 'বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স' বা 'বি.ভি.' দলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ১. প্রতিষ্ঠা: ১৯২৮ সালে কলকাতায় কংগ্রেস অধিবেশনের সময় সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে এটি একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসাবে গঠিত হয়। পরে হেমচন্দ্র ঘোষ ও মেজর সত্য গুপ্তের পরিচালনায় এটি একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনে পরিণত হয়।
- ২. রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান (অলিন্দ যুদ্ধ): এই সংগঠনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি ছিল ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্তের রাইটার্স বিল্ডিং (মহাকরণ) অভিযান। তাঁরা কারাবিভাগের অধিকর্তা কর্নেল সিম্পসনকে হত্যা করেন। এই ঘটনা 'অলিন্দ যুদ্ধ' নামে খ্যাত, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
- ৩. অন্যান্য কর্মকাণ্ড: এর সদস্যরা বিভিন্ন জেলায় (বিশেষত ঢাকা, মেদিনীপুর) সক্রিয় ছিলেন। দীনেশ গুপ্তের ফাঁসি হয়। মেদিনীপুরে এই দলের সদস্যরা পরপর তিনজন কুখ্যাত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (পেডি, ডগলাস, বার্জ) হত্যা করেন।
বি.ভি. দলের এই দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড বাংলার যুবসমাজকে তীব্রভাবে বিপ্লবী আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছিল।
-
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো। Madhyamik 2024
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে (১৯০৫) বাংলার ছাত্রসমাজ এক স্বতঃস্ফূর্ত ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।
- ১. বয়কট ও পিকেটিং: ছাত্ররা ছিল এই আন্দোলনের মূল প্রাণশক্তি। তারা স্কুল-কলেজ বয়কট করে, বিলাতি জিনিসপত্রের দোকানে পিকেটিং করে এবং বিদেশি পণ্য আগুনে পুড়িয়ে ফেলে।
- ২. অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি: যখন ব্রিটিশ সরকার কার্লাইল সার্কুলারের মাধ্যমে ছাত্রদের আন্দোলন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে, তখন শচীন্দ্রপ্রসাদ বসুর নেতৃত্বে 'অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি' (১৯০৫) গঠিত হয়। এটি বিতাড়িত ছাত্রদের পাশে দাঁড়ায় এবং তাদের জন্য বিকল্প জাতীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করে।
- ৩. স্বদেশি প্রচার: ছাত্ররা গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি দিয়ে স্বদেশি দ্রব্য বিক্রির মাধ্যমে এবং স্বদেশি ভাবধারা প্রচার করে জনমত গঠন করে।
এভাবেই ছাত্রসমাজ নিষ্ক্রিয় প্রতিবাদের স্তর থেকে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তুলে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে এক গণ-আন্দোলনের রূপ দিয়েছিল।
-
বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলনের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। Madhyamik 2024 & 2020
বিশ শতকের বাংলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে নমঃশূদ্র আন্দোলন ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
- ১. পটভূমি: বাংলার (বিশেষত ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ) অস্পৃশ্য নমঃশূদ্র (চণ্ডাল) সম্প্রদায় বর্ণহিন্দুদের হাতে সামাজিক বঞ্চনা, শোষণ ও অত্যাচারের শিকার ছিল।
- ২. মতুয়া আন্দোলন: এই সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে হরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২-৭৮) নমঃশূদ্রদের মধ্যে 'মতুয়া' নামে এক বিকল্প ধর্মীয় আন্দোলন শুরু করেন, যা ছিল সহজ-সরল ও মানবতাবাদী।
- ৩. গুরুচাঁদ ঠাকুরের ভূমিকা: হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর (১৮৪৭-১৯৩৭) এই আন্দোলনকে সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপ দেন। তিনি 'মতুয়া মহাসংঘ' প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নেতৃত্বে নমঃশূদ্ররা শিক্ষার প্রসার, সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য সংগঠিত হয়।
- ৪. রাজনৈতিক গুরুত্ব: গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে নমঃশূদ্ররা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে (কারণ তারা বর্ণহিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত কংগ্রেসকে বিশ্বাস করত না) নিজেদের জন্য শিক্ষা, চাকরি ও আইনসভায় প্রতিনিধিত্বের দাবি আদায় করে নেয়।
এই আন্দোলন ছিল বাংলার দলিত বা প্রান্তিক শ্রেণির আত্মমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
-
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নারীসমাজ কীভাবে অংশগ্রহণ করেছিল? তাদের আন্দোলনের 'সীমাবদ্ধতা কী? Madhyamik 2019
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে (১৯০৫) বাংলার নারীরা প্রথাগত পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে প্রথমবার রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
অংশগ্রহণ:
- ১. বয়কট ও স্বদেশি: নারীরা ব্যাপকভাবে বিলাতি দ্রব্য (চুড়ি, সাবান) বর্জন করেন এবং স্বদেশি জিনিসপত্র ব্যবহারের শপথ নেন। সরলাদেবী চৌধুরানী 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' (১৯০৪) প্রতিষ্ঠা করে স্বদেশি দ্রব্যের প্রচার ও বিক্রির ব্যবস্থা করেন।
- ২. রাখিবন্ধন ও অরন্ধন: রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে নারীরা রাখিবন্ধন উৎসবে যোগ দেন। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে বঙ্গভঙ্গের দিন (১৬ই অক্টোবর) তারা বাড়িতে 'অরন্ধন' পালন করেন।
- ৩. সভা-সমিতি: খয়রুন্নেসা খাতুন, অবলা বসু প্রমুখের নেতৃত্বে নারীরা বিভিন্ন সভা-মিছিলে যোগ দেন এবং স্বদেশি আন্দোলনে অর্থ সংগ্রহের (তহবিল) জন্য নিজেদের গয়না পর্যন্ত দান করেন।
সীমাবদ্ধতা:
- ১. শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা: এই আন্দোলন মূলত কলকাতা ও শহরের শিক্ষিত, উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ স্তরে বা কৃষক নারীদের মধ্যে এর প্রভাব বিশেষ পড়েনি।
- ২. ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা: আন্দোলনের হিন্দু (যেমন - লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, বীরাষ্টমী ব্রত) প্রতীক ব্যবহারের ফলে মুসলিম নারী সমাজ এই আন্দোলন থেকে অনেকাংশে দূরে সরে ছিল।
- ৩. নেতৃত্বের অভাব: নারীরা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব ছিল পুরুষদের হাতেই; নারীরা মূলত সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
-
দলিত আন্দোলন বিষয়ে গান্ধি-আম্বেদকর বিতর্ক নিয়ে একটি টীকা লেখ। Madhyamik 2017
বিশ শতকের ভারতে দলিত শ্রেণির রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে মহাত্মা গান্ধি ও ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের মধ্যে এক তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছিল, যা 'গান্ধি-আম্বেদকর বিতর্ক' নামে পরিচিত।
- ১. বিতর্কের প্রেক্ষাপট: ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে ডঃ আম্বেদকর দলিতদের 'স্বতন্ত্র নির্বাচকমণ্ডলী' (Separate Electorates)-এর দাবি জানান। তিনি মনে করতেন, হিন্দু সমাজ থেকে পৃথক হয়ে রাজনৈতিক অধিকার আদায় না করলে দলিতদের মুক্তি সম্ভব নয়।
- ২. সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা ও গান্ধিজির প্রতিবাদ: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড 'সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা' (১৯৩২) ঘোষণা করে আম্বেদকরের দাবি মেনে নেন। গান্ধিজি মনে করেন যে, এটি হিন্দু সমাজকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করার একটি ব্রিটিশ চক্রান্ত। এর প্রতিবাদে তিনি পুণার ইয়েরওয়াড়া জেলে আমরণ অনশন শুরু করেন।
- ৩. পুণা চুক্তি (১৯৩২): গান্ধিজির স্বাস্থ্যের অবনতি হলে এক চরম সংকটের সৃষ্টি হয়। অবশেষে, আম্বেদকর বাধ্য হয়ে গান্ধিজির সঙ্গে এক চুক্তিতে আসেন, যা 'পুণা চুক্তি' নামে খ্যাত।
- ৪. চুক্তির ফল: এই চুক্তির মাধ্যমে দলিতদের জন্য 'স্বতন্ত্র নির্বাচকমণ্ডলী'-এর দাবি প্রত্যাহার করা হয় এবং তার বদলে ব্রিটিশ আইনসভার (প্রাদেশিক) জন্য সাধারণ আসনসংখ্যার মধ্যেই ১৪৮টি আসন দলিতদের জন্য সংরক্ষিত (Reserved Seats) রাখা হয়।
-
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ কর। Madhyamik 2017
বিশ শতকের ভারতে, বিশেষত বাংলায়, সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ছিল অসামান্য ও বীরত্বপূর্ণ। তাঁরা শুধুমাত্র বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়া বা খবর আদান-প্রদান করার মতো সহায়ক ভূমিকায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন।
- ১. বিপ্লবী সংগঠন: লীলা নাগ (রায়) 'দীপালি সংঘ' (১৯২৩) এবং লতিকা ঘোষ 'মহিলা রাষ্ট্রীয় সংঘ' প্রতিষ্ঠা করে নারীদের শরীরচর্চা, লাঠিখেলা ও অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ দেন, যা তাদের বিপ্লবী কাজের জন্য প্রস্তুত করে।
- ২. ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি (IRA): মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিদ্রোহে (১৯৩০) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। প্রীতিলতা ১৯৩২ সালে 'পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব' আক্রমণে নেতৃত্ব দেন এবং আত্মাহুতি দেন। কল্পনা দত্ত চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের মামলায় গ্রেপ্তার হন।
- ৩. সরাসরি আক্রমণ: 'বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স' (BV)-এর সদস্যা শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী (১৯৩১) কুমিল্লার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে হত্যা করেন। বীণা দাস (১৯৩২) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি করেন।
এইভাবে, প্রীতিলতা, কল্পনা, বীণা, শান্তি, সুনীতি প্রমুখ নারীরা তাঁদের অসামান্য সাহস ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে বিপ্লবী আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রা দেন।