গল্প: নদীর বিদ্রোহ (Nodir Bidroho)
গল্পের সারসংক্ষেপ
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নদীর বিদ্রোহ' গল্পটি নদেরচাঁদ নামে একজন স্টেশন মাস্টারের নদী-প্রেমের এক করুণ কাহিনী। ত্রিশ বছর বয়সী নদেরচাঁদ পেশাগতভাবে দায়িত্বশীল হলেও নদীর প্রতি তার এক তীব্র, প্রায় পাগলামো পর্যায়ের ভালোবাসা ছিল। শৈশব থেকে নদীর ধারে বেড়ে ওঠার কারণে নদীর সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
টানা পাঁচ দিনের অবিরাম বৃষ্টির পর নদীর উন্মত্ত রূপ দেখার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সে নদীর উপর তৈরি ব্রিজের কাছে গিয়ে বসে নদীর ভয়ংকর সৌন্দর্য উপভোগ করে। নদীর এই উত্তাল রূপ দেখে তার মনে হয়, নদী যেন মানুষের তৈরি বাঁধ ও ব্রিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। নদীর এই 'বিদ্রোহ' তাকে রোমাঞ্চিত করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই নদীর প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসাই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। নদীর রূপ দেখার নেশায় সে এতটাই আচ্ছন্ন ছিল যে, পিছন থেকে আসা ট্রেনের শব্দ সে শুনতে পায়নি এবং ট্রেনের ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়। মানুষের তৈরি যন্ত্রের কাছে প্রকৃতির প্রেমিকের এই করুণ পরিণতি গল্পটিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
-
নদেরচাঁদের বয়স হলো - (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: (ক) ত্রিশ বছর
-
নদেরচাঁদ কতদিন নদীকে দেখতে পায়নি? (পাঠ্যবই)
উত্তর: (গ) পাঁচদিন
-
নদেরচাঁদ পেশায় কী ছিল? (পাঠ্যবই)
উত্তর: (খ) স্টেশন মাস্টার
-
নদেরচাঁদ বউকে কত পাতার চিঠি লিখেছিল? (পাঠ্যবই)
উত্তর: (গ) পাঁচ পাতা
-
নদেরচাঁদ পকেট থেকে কী বের করে নদীর স্রোতে ছুড়ে দিয়েছিল? (পাঠ্যবই)
উত্তর: (খ) একটি পুরাতন চিঠি
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
-
নদীর বিদ্রোহ' গল্পের লেখকের প্রকৃত নাম কী? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: 'নদীর বিদ্রোহ' গল্পের লেখকের প্রকৃত নাম প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ছদ্মনাম)
-
"বড়ো ভয় করিতে লাগিল নদের চাঁদের।" - নদের চাঁদ কে? কখন তার ভয় করছিল? (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: নদের চাঁদ হলো 'নদীর বিদ্রোহ' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র, যে পেশায় একজন স্টেশন মাস্টার। অবিরাম বৃষ্টির পর যখন সে নদীর উন্মত্ত ও ভয়ংকর রূপ দেখেছিল এবং নদীর সঙ্গে মানুষের তৈরি ব্রিজের সংঘাত উপলব্ধি করেছিল, তখনই তার মনে বড়ো ভয় হয়েছিল।
-
"নদেরচাঁদ ছেলেমানুষের মতো ঔৎসুক্য বোধ করিতে লাগিল।" - কী বিষয়ে নদেরচাঁদের ঔৎসুক্য ছিল? (পাঠ্যবই)
উত্তর: টানা পাঁচ দিনের অবিরাম বৃষ্টির পর নদীর রূপ কেমন হয়েছে, তা দেখার জন্য নদেরচাঁদের ছেলেমানুষের মতো ঔৎসুক্য জেগেছিল।
-
নদীর বিদ্রোহের কারণ সে বুঝিতে পারিয়াছে। - নদীর বিদ্রোহের কারণ কী? (পাঠ্যবই)
উত্তর: নদীর স্বাভাবিক গতিপথে মানুষ বাঁধ ও ব্রিজ তৈরি করে বাধা সৃষ্টি করেছে। এই বাধার বিরুদ্ধে নদীর যে রুদ্রমূর্তি ও ফুঁসে ওঠা, তাকেই নদেরচাঁদ নদীর বিদ্রোহ বলে মনে করেছে।
প্রসঙ্গ নির্দেশ করে কমবেশি ৬০টি শব্দের মধ্যে উত্তর
-
"নিজের এই পাগলামিতে যেন আনন্দই উপভোগ করে।" - কার পাগলামির কথা বলা হয়েছে? পাগলামিটি কী? (পাঠ্যবই)
উত্তর: এখানে স্টেশন মাস্টার নদেরচাঁদের পাগলামির কথা বলা হয়েছে।
নদেরচাঁদের পাগলামিটি হলো নদীর প্রতি তার অস্বাভাবিক ভালোবাসা। ত্রিশ বছর বয়সে একজন দায়িত্বশীল স্টেশন মাস্টার হয়েও নদীর জন্য তার এই তীব্র আবেগ ও ব্যাকুলতা ছিল সাধারণ মানুষের চোখে পাগলামির নামান্তর। কিন্তু এই পাগলামিতেই সে এক ধরনের আনন্দ খুঁজে পেত। -
"আজ তার মনে হইল কী প্রয়োজন ছিল ব্রিজের?" - নদেরচাঁদের কেন এমন মনে হয়েছিল? (পাঠ্যবই)
উত্তর: নদীর উন্মত্ত ও বিদ্রোহী রূপ দেখে নদেরচাঁদ উপলব্ধি করেছিল যে, ব্রিজ তৈরির মাধ্যমে মানুষ নদীর স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করে তাকে বন্দী করেছে। নদীর এই বন্দীদশা তাকে ব্যথিত করেছিল। তাই একসময় যে ব্রিজের জন্য সে গর্ব অনুভব করত, নদীর কষ্টের কথা ভেবে সেই ব্রিজের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
-
"নদীকে এভাবে ভালোবাসিবার একটা কৈফিয়ত নদেরচাঁদ দিতে পারে।" - নদেরচাঁদ কী কৈফিয়ত দিতে পারে? এভাবে ভালোবাসার কী পরিণতি হয়? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নদীর বিদ্রোহ' গল্পের প্রধান চরিত্র নদেরচাঁদ নদীর প্রতি তার অস্বাভাবিক ভালোবাসার সপক্ষে একটি যুক্তিসঙ্গত কৈফিয়ত দিতে পারে।
কৈফিয়ত: নদেরচাঁদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নদীর ধারে। শৈশব, কৈশোর ও প্রথম যৌবনে সে নদীর সান্নিধ্যে কাটিয়েছে। দেশের ক্ষীণস্রোতা নদীর প্রতি তার গভীর মমতা ছিল। একবার অনাবৃষ্টিতে সেই নদী শুকিয়ে যেতে বসলে সে অসুস্থ আত্মীয়ের জন্য মানুষের মতোই কেঁদেছিল। নদীর প্রতি এই আজন্ম ভালোবাসা ও আত্মিক সম্পর্কের কথাই সে কৈফিয়ত হিসেবে দিতে পারে।
পরিণতি: এই ভালোবাসার পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। নদীর উন্মত্ত রূপ দেখার নেশায় সে এতটাই বিভোর ছিল যে, নিজের কর্তব্য ও নিরাপত্তার কথা ভুলে গিয়েছিল। স্টেশনের দিকে ফেরার পথে পিছন থেকে আসা ৭ নম্বর ডাউন প্যাসেঞ্জার ট্রেনের শব্দ সে শুনতে পায়নি এবং ট্রেনের ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়। যে যন্ত্রের (ট্রেন ও ব্রিজ) সাহায্যে মানুষ নদীকে বন্দী করেছিল, সেই যন্ত্রই শেষ পর্যন্ত নদী-প্রেমিক নদেরচাঁদের প্রাণ কেড়ে নিল। -
'নদীর বিদ্রোহ' গল্প অবলম্বনে নদীর প্রতি নদেরচাঁদের ভালোবাসার পরিচয় দাও। (Important)
উত্তর: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নদীর বিদ্রোহ' গল্পে নদেরচাঁদের চরিত্রটি নদী-প্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার ভালোবাসার কয়েকটি দিক নিচে আলোচনা করা হলো:
১. আত্মিক সম্পর্ক: নদীর সঙ্গে নদেরচাঁদের সম্পর্ক ছিল নাড়ির টানে। শৈশব থেকে নদীর সান্নিধ্যে বড় হওয়ার ফলে নদী ছিল তার কাছে জীবন্ত সত্তা ও পরম আত্মীয়ের মতো।
২. গভীর মমতা: দেশের ক্ষীণস্রোতা নদীর দুরবস্থা দেখে সে ব্যথিত হতো, এমনকি কেঁদেও ফেলত। কর্মস্থলের বিশাল নদীকেও সে একইভাবে ভালোবেসেছিল।
৩. নদীর আবেগে একাত্ম হওয়া: নদীর উন্মত্ত রূপ দেখে সে নদীর বিদ্রোহকে অনুভব করতে পেরেছিল। নদীর বন্দীদশা তাকেও পীড়িত করত। সে নদীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে চিঠির পাতা ভাসিয়ে খেলা করত।
পরিশেষে বলা যায়, নদীর প্রতি এই তীব্র ভালোবাসাই তাকে কর্তব্যভোলা করেছিল এবং তার করুণ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।