অষ্টম শ্রেণীর বাংলা সমাধান - সুভা

WBBSE-র 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের "সুভা" গল্পের সম্পূর্ণ সমাধান।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
বিজ্ঞাপন

গল্প: সুভা

লেখক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


লেখক সম্পর্কে আলোচনা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১ – ১৯৪১): তিনি কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটোগল্পকার, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক। ছোটদের জন্য তিনি 'সহজপাঠ', 'ছেলেবেলা', 'শিশু ভোলানাথ'-এর মতো অসাধারণ লেখা লিখেছেন। ১৯১৩ সালে 'গীতাঞ্জলি' কাব্যের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ভারত ও বাংলাদেশ—দুটি দেশের জাতীয় সংগীতই তাঁর লেখা।

Rabindranath Tagore

গল্পের সারসংক্ষেপ

সুভা গল্পটি সুভাষিণী নামের এক বাক্‌প্রতিবন্ধী মেয়ের কাহিনি। কথা বলতে না পারার কারণে সে তার নিজের পরিবার ও সমাজের কাছে ছিল অবহেলিত। তার মা তাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক মনে করতেন, কিন্তু বাবা বাণীকণ্ঠ তাকে ভালোবাসতেন। মানুষের সঙ্গে মিশতে না পারলেও সুভার এক সুন্দর জগৎ ছিল, যেখানে প্রকৃতি এবং কয়েকটি বোবা প্রাণী—দুটি গাভী (সর্বশী ও পাঙ্গুলি), ছাগল ও বিড়ালছানা—ছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। গোঁসাইদের ছোট ছেলে প্রতাপও তার একজন সঙ্গী ছিল, যে মাছ ধরার সময় তার নীরব সঙ্গ পছন্দ করত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সুভার বিয়ের জন্য তার বাবা-মা চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং তাকে কলকাতায় নিয়ে যান। সেখানে এক পরিবারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পরেই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা জানতে পারে যে সে কথা বলতে পারে না। ফলে, তার স্বামী আবার বিয়ে করে এবং সুভা সম্পূর্ণ একা হয়ে যায়। এই গল্পে автор এক সংবেদনশীল মেয়ের নীরব যন্ত্রণা এবং সমাজের অমানবিকতার ছবি এঁকেছেন।


অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর (হাতে কলমে)

১. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

১.১ জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত কোন পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত লিখতেন?
উত্তর: জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত 'ভারতী' ও 'বালক' পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত লিখতেন।

১.২ ভারতের কোন প্রতিবেশী দেশে তাঁর লেখা গান জাতীয় সংগীত হিসাবে গাওয়া হয়?
উত্তর: ভারতের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে তাঁর লেখা গান ('আমার সোনার বাংলা') জাতীয় সংগীত হিসেবে গাওয়া হয়।

২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও :

২.১ সুভার প্রকৃত নাম কী?
উত্তর: সুভার প্রকৃত নাম সুভাষিণী।

২.২ সুভার বাবা কে?
উত্তর: সুভার বাবা হলেন বাণীকণ্ঠ।

২.৩ সুভা কোন গ্রামে বাস করত?
উত্তর: সুভা চণ্ডীপুর গ্রামে বাস করত।

২.৪ গল্পে সুভার কোন কোন বন্ধুর কথা রয়েছে?
উত্তর: গল্পে সুভার বন্ধুদের মধ্যে দুটি গাভী—সর্বশী ও পাঙ্গুলি, একটি ছাগল, একটি বিড়ালশাবক এবং গোঁসাইদের ছেলে প্রতাপের কথা রয়েছে।

২.৫ কে সুভাকে 'সু' বলে ডাকত?
উত্তর: গোঁসাইদের ছোট ছেলে প্রতাপ সুভাকে আদর করে 'সু' বলে ডাকত।

৩. নীচের প্রশ্নগুলির সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও :

৩.১ 'সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন'— সুভা সম্পর্কে এ রকম উপমা লেখক ব্যবহার করেছেন কেন?
উত্তর: দুপুরবেলা যেমন চারিদিক শান্ত, নীরব ও কোলাহলশূন্য থাকে, তেমনই সুভাও ছিল চুপচাপ, শব্দহীন এবং একা। তার এই নীরব ও নিঃসঙ্গ স্বভাবকে বোঝানোর জন্যই লেখক এই উপমাটি ব্যবহার করেছেন।

৩.২ চণ্ডিপুর গ্রামের বর্ণনা দাও।
উত্তর: চণ্ডীপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বাংলাদেশের একটি ছোট নদী বয়ে গেছে। নদীর দুই তীরে ঘন গাছপালায় ঢাকা উঁচু পাড় এবং লোকালয় রয়েছে। সুভাদের বাড়িটি ছিল ঠিক নদীর উপরেই, যেখানে বাঁখারির বেড়া, আটচালা, গোয়ালঘর এবং আম, কাঁঠাল ও কলার বাগান ছিল।

৩.৩ সুভার সঙ্গে সর্বশী ও পাঙ্গুলির সম্পর্ক কী রকম ছিল?
উত্তর: সর্বশী ও পাঙ্গুলি নামের গাভী দুটি ছিল সুভার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তারা সুভার পায়ের শব্দ চিনত এবং তার আদর, ভর্ৎসনা বা মিনতির নীরব ভাষা বুঝতে পারত। সুভা দুঃখ পেলে তারাও যেন তা অনুভব করত এবং গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করত।

৩.৪ 'এইজন্য প্রতাপ সুভার মর্যাদা বুঝিত'— প্রতাপের কাছে সুভা কীভাবে মর্যাদা পেত, তা গল্প অবলম্বনে লেখো।
উত্তর: প্রতাপের প্রধান শখ ছিল ছিপ ফেলে মাছ ধরা। মাছ ধরার সময় নীরবতা প্রয়োজন, তাই কথা না বলা সঙ্গীই তার কাছে শ্রেষ্ঠ ছিল। সুভা চুপচাপ তার পাশে বসে থাকত, তাই প্রতাপ তার এই নীরব সঙ্গকে মর্যাদা দিত এবং তাকে আদর করে 'সু' বলে ডাকত।

৩.৫ 'তাহাদের জাতি ও পরকাল রক্ষা হইল'— কাদের সম্পর্কে এ কথা লেখক বলেছেন? তাঁর এরূপ মন্তব্যের কারণ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: এ কথা সুভার বাবা-মায়ের সম্পর্কে বলা হয়েছে।
তৎকালীন সমাজে মেয়ের বিয়ে না দেওয়াটা একটা বড় লজ্জার এবং অসম্মানের বিষয় ছিল। বাক্‌প্রতিবন্ধী মেয়েকে পাত্রস্থ করে তারা সমাজের চোখে নিজেদের দায়িত্ব পালন করলেন এবং জাতি ও পরকাল রক্ষা করলেন বলে মনে করলেন। লেখকের এই মন্তব্যের মাধ্যমে সমাজের এই সংকীর্ণ মানসিকতাকে কটাক্ষ করা হয়েছে।

৪. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো:

৪.১ 'প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়'— মানুষের ভাষার অভাব কীভাবে প্রকৃতি পূরণ করতে পারে তা আলোচনা করো।
উত্তর: সুভা কথা বলতে পারত না, তাই প্রকৃতিই ছিল তার ভাব প্রকাশের মাধ্যম। নদীর কলকল শব্দ, পাখির ডাক, গাছের পাতার মর্মর ধ্বনি—এই সবই যেন সুভার মনের কথা হয়ে উঠত। সে যখন প্রকৃতির মাঝে একা বসে থাকত, তখন প্রকৃতির এই বিচিত্র শব্দ এবং গতি তার মনের সব অনুভূতিকে প্রকাশ করত। এভাবেই প্রকৃতি তার ভাষার অভাব পূরণ করে দিত।

৪.২ সুভার সঙ্গে মনুষ্যেতর প্রাণীর বন্ধুত্ব কেমন ছিল তা লেখো।
উত্তর: সুভার সঙ্গে মানুষের চেয়ে বোবা প্রাণীদের বন্ধুত্ব ছিল অনেক গভীর। গোয়ালের গাভী দুটি, সর্বশী ও পাঙ্গুলি, ছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তারা সুভার আদর, কষ্ট—সবই বুঝত এবং তাকে সান্ত্বনা দিত। এছাড়া একটি ছাগল ও বিড়ালছানাও তার সঙ্গী ছিল। এই প্রাণীরা কথা বলতে না পারলেও সুভার নীরব ভালোবাসা ও কষ্ট তারা অনুভব করতে পারত, যা মানুষ পারত না।

৪.৩ শুক্লা দ্বাদশীর রাত্রিতে সুভার মনে অবস্থা কেমন ছিল? তার মনের অবস্থা এরকম হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: শুক্লা দ্বাদশীর রাতে সুভার মন দুঃখে ও কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সে তার চিরচেনা গ্রাম, নদী, তার প্রিয় পশুবন্ধুদের ছেড়ে কলকাতায় চলে যাচ্ছে, এই ভাবনা তাকে কষ্ট দিচ্ছিল। তাই সে রাতে সে নদীতীরে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ে পৃথিবীকে জড়িয়ে ধরে বলতে চেয়েছিল, 'মা, তুমি আমাকে যেতে দিও না'।

৪.৪ গল্পের একেবারে শেষ বাক্যটি গল্পের ক্ষেত্রে কতখানি প্রয়োজন আলোচনা করো।
উত্তর: গল্পের শেষ বাক্যটি, "এবার তাহার স্বামী চক্ষু এবং কর্ণেন্দ্রিয়ের দ্বারা পরীক্ষা করিয়া এক ভাষাবিশিষ্ট কন্যা বিবাহ করিয়া আনিল," অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই বাক্যটি গল্পের করুণ পরিণতিকে সম্পূর্ণ করে। এটি দেখায় যে সমাজ এবং তার স্বামী সুভার মন বা তার চোখের ভাষাকে কোনোদিনও বোঝেনি, তারা শুধু কথা বলতে পারাটাকেই গুরুত্ব দিয়েছে। এই বাক্যটি সুভার জীবনের চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি এবং সমাজের অসংবেদনশীলতাকে তীব্রভাবে প্রকাশ করে।

৪.৫ মানুষ ও মনুষ্যেতর প্রাণীর বন্ধুত্ব নিয়ে আরো দু একটি গল্পের নাম লেখো এবং 'সুভা' গল্পটির সঙ্গে তুলনা করো।
উত্তর: মানুষ ও মনুষ্যেতর প্রাণীর বন্ধুত্ব নিয়ে আরও দুটি বিখ্যাত গল্প হলো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'মহেশ' এবং নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'টোপ'।
তুলনা: 'সুভা' গল্পে বাক্‌প্রতিবন্ধী একটি মেয়ের সঙ্গে তার পোষ্য প্রাণীদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সম্পর্ক দেখানো হয়েছে, যা তার একাকিত্ব দূর করে। 'মহেশ' গল্পেও দরিদ্র কৃষক গফুরের সাথে তার বৃদ্ধ ষাঁড় মহেশের গভীর মমতার সম্পর্ক ফুটে উঠেছে। উভয় গল্পেই প্রাণীরা মানুষের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল। তবে 'সুভা' গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু সমাজের কাছে এক প্রতিবন্ধী মেয়ের অবহেলা, আর 'মহেশ' গল্পের কেন্দ্রবিন্দু দারিদ্র্য ও জমিদারি শোষণ।

শব্দার্থ: দস্তুরমতো – রীতিমতো/বিলক্ষণ। বিরাজ – সগৌরবে অবস্থান। জাগরুক – জাগ্রত/সজাগ। তরজমা – অনুবাদ। অকর্মণ্য – যে লোক কোনো কাজের নয়। অনির্বচনীয় – যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মর্মবিদ্ধ – হৃদয় বিদারক। কপোল – গাল। শল্পশয্যা – কচি ঘাসের বিছানা। নেপথ্য – অন্তরাল। শুক্তি – ঝিনুক। অনতিবিলম্বে – শীঘ্রই। অন্তর্যামী – ঈশ্বর।

৫. নীচের বাক্যগুলিকে কর্তা-খণ্ড ও ক্রিয়া-খণ্ডে ভাগ করে দেখাও :

৫.১ সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন।
উত্তর: কর্তা-খণ্ড: সে, ক্রিয়া-খণ্ড: নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন।

৫.২ সে যে কাজকর্ম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে যত্ন করিবে, বহু চেষ্টার পর বাপ-মা সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন।
উত্তর: কর্তা-খণ্ড: বাপ-মা, ক্রিয়া-খণ্ড: সে যে কাজকর্ম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে যত্ন করিবে, বহু চেষ্টার পর সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন।

৫.৩ এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ব আছে।
উত্তর: কর্তা-খণ্ড: বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ব, ক্রিয়া-খণ্ড: এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে আছে।

৬. নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন করো:

৬.১ সুভা তেঁতুলতলায় বসিয়া থাকিত এবং প্রতাপ অনতি দূরে মাটিতে ছিপ ফেলিয়া জলের দিকে চাহিয়া থাকিত। (জটিল বাক্যে)
উত্তর: যখন সুভা তেঁতুলতলায় বসে থাকত, তখন প্রতাপ অনতিদূরে মাটিতে ছিপ ফেলে জলের দিকে চেয়ে থাকত।

৬.২ বাণীকণ্ঠ নিদ্রা হইতে উঠিয়া শয়নগৃহে তামাক খাইতেছিল। (যৌগিক বাক্যে)
উত্তর: বাণীকণ্ঠ নিদ্রা থেকে উঠলেন এবং শয়নগৃহে তামাক খাচ্ছিলেন।

৬.৩ বাণীকণ্ঠের ঘর একেবারে নদীর উপরেই। তাহার বাখারির বেড়া, আটচালা, গোয়ালঘর, ঢেঁকিশালা, খড়ের স্তূপ, তেঁতুলতলা, আম, কাঁঠাল এবং কলার বাগান নৌকোবাহী মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। (একটি সরল বাক্যে পরিণত করো।)
উত্তর: নদীর উপরে অবস্থিত বাণীকণ্ঠের বাখারির বেড়া, আটচালা, গোয়ালঘর, ঢেঁকিশালা, খড়ের স্তূপ, তেঁতুলতলা, আম, কাঁঠাল ও কলার বাগান নৌকাবাহী মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

৬.৪ প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়। যেন তাহার হইয়া কথা কয়। (একটি সরল বাক্যে পরিণত করো)
উত্তর: প্রকৃতি যেন তার ভাষার অভাব পূরণ করে তার হয়ে কথা বলে।

৭. শূন্যস্থান পূরণ করো:

৭.১ অনু + ভব = অনুভব

৭.২ প্র + মান = প্রমাণ

৭.৩ দিগ্বিদিক = দিক্ + বিদিক

৭.৪ গৃহস্থ > গেরস্ত (স্বরসংগতি)

৭.৫ পঞ্জিকা > পাঁজি (নাসিক্যীভবন ও স্বরলোপ)

বিজ্ঞাপন