অষ্টম শ্রেণীর বাংলা সমাধান - পথচলতি

WBBSE-র 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের "পথচলতি" পাঠ্যাংশের সম্পূর্ণ সমাধান।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
বিজ্ঞাপন

পথচলতি

লেখক: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়


লেখক সম্পর্কে আলোচনা

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭): তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক এবং শিক্ষাবিদ। হাওড়ার শিবপুরে তাঁর জন্ম। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে তাঁর লেখা 'The Origin and Development of the Bengali Language' একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ। এছাড়াও তিনি 'দ্বীপময় ভারত', 'সাংস্কৃতিকী' এবং তাঁর আত্মজীবনী 'জীবনকথা'-র মতো গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন।

Suniti Kumar Chattopadhyay

পাঠ্যাংশের সারসংক্ষেপ

গয়া থেকে ফেরার পথে লেখক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় দেহরা-দুন এক্সপ্রেস ট্রেনে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে তিনি একটি খালি তৃতীয় শ্রেণির কামরায় উঠতে বাধ্য হন, যা কয়েকজন কাবুলিওয়ালা বা পাঠান দখল করে রেখেছিল। লেখক তাঁর ফারসি ভাষার জ্ঞানের সাহায্যে পাঠানদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের মন জয় করে কামরায় জায়গা করে নেন।

এরপর পুরো যাত্রাপথটি এক আনন্দময় আড্ডায় পরিণত হয়। লেখক পাঠানদের সঙ্গে তাদের ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি পশতু ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি খুশ-হাল খাঁ খট্টকের গজল এবং আদম খান ও দুরখানির প্রেমের কাহিনি শোনেন। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে একটি সহজ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই ভ্রমণ লেখকের মনে এক अविस्मरणीय স্মৃতি হয়ে থাকে।


অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর (হাতে কলমে)

১. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

১.১ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের আত্মজীবনীর নাম কী?
উত্তর: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের আত্মজীবনীর নাম 'জীবনকথা'।

১.২ ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে কোন গ্রন্থ রচনার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন?
উত্তর: ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে 'The Origin and Development of the Bengali Language' গ্রন্থটি রচনার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।

২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও :

২.১ লেখকের কোন ট্রেন ধরার কথা ছিল?
উত্তর: লেখকের দেহরা-দুন এক্সপ্রেস ধরার কথা ছিল।

২.২ একটা তৃতীয় শ্রেণির বগির কাছে একেবারেই লোকের ভিড় নেই কেন?
উত্তর: কারণ বগিটি কয়েকজন জবরদস্ত চেহারার কাবুলিওয়ালা দখল করে রেখেছিল এবং অন্য কাউকে উঠতে দিচ্ছিল না।

২.৩ পাঠানদের মাতৃভাষা কী?
উত্তর: পাঠানদের মাতৃভাষা পশতু।

২.৪ বৃদ্ধ পাঠানের ডেরা বাংলাদেশের কোথায় ছিল?
উত্তর: বৃদ্ধ পাঠানের ডেরা বাংলাদেশের বরিশালের পটুয়াখালিতে ছিল।

২.৫ খুশ-হাল খাঁ খট্টক কে ছিলেন?
উত্তর: খুশ-হাল খাঁ খট্টক ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ের পশতু ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি।

২.৬ আদম খাঁ ও দুরখানির কিসসার কাহিনি কেমন?
উত্তর: আদম খাঁ ও দুরখানির কিসসার কাহিনি ছিল দিল-ভাঙা বা হৃদয়বিদারক।

২.৭ এই পাঠ্যে কোন বাংলা মাসিকপত্রের উল্লেখ আছে?
উত্তর: এই পাঠ্যে 'প্রবর্তক' নামে একটি বাংলা মাসিকপত্রের উল্লেখ আছে।

২.৮ রোজার উপোসের আগে কাবুলিওয়ালারা ভরপেট কী খেয়েছিলেন?
উত্তর: রোজার উপোসের আগে কাবুলিওয়ালারা ভোরবেলায় বড়ো বড়ো পাঠান 'রোটা' আর কাবাব খেয়েছিলেন।

২.৯ 'তসবিহ' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'তসবিহ' শব্দের অর্থ জপমালা।

২.১০ আরবি ভাষায় ঈশ্বরের নিরানব্বইটি পবিত্র ও সুন্দর নামকে কী বলা হয়?
উত্তর: আরবি ভাষায় ঈশ্বরের নিরানব্বইটি পবিত্র ও সুন্দর নামকে 'নব্বদ-ও-নও অসমা-ই-হাসানা' বলা হয়।

৩. নিম্নলিখিত শব্দগুলির সন্ধি বিচ্ছেদ করো:

হুংকার: হুম্ + কার।

স্বস্তি: সু + অস্তি।

বিষয়ান্তর: বিষয় + অন্তর।

৪. নিম্নলিখিত শব্দগুলির প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয় করো:

ফিরতি: ফির + তি।

আভিজাত্য: অভিজাত + য।

জবরদস্ত: জবর + দস্ত (ফারসি প্রত্যয়)।

নিবিষ্ট: নি + √विश् + ত।

উৎসাহিত: উৎ + √সাহ্ + ইত।

৫. ব্যাসবাক্য সহ সমাসের নাম লেখো:

শীতবস্ত্র: শীত নিবারণের জন্য বস্ত্র – মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস।

মাতৃভাষা: মাতৃ সম্বন্ধীয় ভাষা – সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস।

শিশুসুলভ: শিশুর সুলভ (মতো) – উপমান কর্মধারয় সমাস।

ত্রিসীমানা: ত্রি (তিন) সীমানার সমাহার – দ্বিগু সমাস।

৬. নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন করো:

৬.১ গাড়িতে সেদিন অসম্ভব ভিড় দেখা গেল। (না-সূচক বাক্যে)
উত্তর: গাড়িতে সেদিন ভিড় কম ছিল না।

৬.২ কাবুলিওয়ালা পাঠানদের মাতৃভাষা পশতুর সম্মান তখন ছিল না। (প্রশ্নবোধক বাক্যে)
উত্তর: কাবুলিওয়ালা পাঠানদের মাতৃভাষা পশতুর সম্মান তখন ছিল কি?

৬.৩ কলকাতার ভাষা তাঁর আয়ত্ত হয়নি। (জটিল বাক্যে)
উত্তর: যে ভাষা কলকাতার, তা তাঁর আয়ত্ত হয়নি।

৬.৪ দুই-একজন মাঝে-মাঝে এক-আধ লবজ ফারসি বললে বটে, কিন্তু এদের বিদ্যেও বেশিদূর এগোল না। (সরল বাক্যে)
উত্তর: দুই-একজনের মাঝে মাঝে এক-আধ লবজ ফারসি বলা সত্ত্বেও তাদের বিদ্যে বেশিদূর এগোলো না।

৬.৫ বাংলাদেশে তোমার ডেরা কোথায়? (নির্দেশক বাক্যে)
উত্তর: আমি বাংলাদেশে তোমার ডেরার কথা জানতে চাই।

৭. প্রসঙ্গ উল্লেখ করে টীকা লেখো:

কাবুলিওয়ালা: আফগানিস্তানের কাবুল শহরের অধিবাসী, যারা মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ভারতে আসত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'কাবুলিওয়ালা' গল্পের কারণে এই চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত।

পশতু: আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পশতুন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা। এটি একটি ইন্দো-ইরানীয় ভাষা।

ফারসি: পারস্য বা ইরানের ভাষা। এটি আফগানিস্তানের অন্যতম সরকারি এবং শিক্ষিত সমাজের ভাষা।

গজল: ফারসি ও উর্দু সাহিত্যের এক বিশেষ ধরনের গান বা কবিতা, যা মূলত প্রেম ও বিরহ নিয়ে রচিত।

উর্দু: ভারত ও পাকিস্তানের একটি প্রধান ভাষা। এর শব্দভান্ডার ফারসি, আরবি ও তুর্কি ভাষা দ্বারা প্রভাবিত।

নমাজ: ইসলাম धर्मावलंबীদের প্রার্থনা করার পদ্ধতি, যা দিনে পাঁচবার করা হয়।

৮. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর কয়েকটি বাক্যে লেখো:

৮.১ স্টেশনে পৌঁছে লেখক কী দেখেছিলেন?
উত্তর: স্টেশনে পৌঁছে লেখক দেখেছিলেন যে দেহরা-দুন এক্সপ্রেস ট্রেনে সেদিন অসম্ভব ভিড়। মধ্যম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কোনো কামরাতেই ঢোকার জায়গা নেই। কিন্তু একটি তৃতীয় শ্রেণির বড় বগি, যা কয়েকজন কাবুলিওয়ালা দখল করে রেখেছিল, সেটি প্রায় খালি ছিল।

৮.২ দু-চারটি ফারসি কথা বলতে পারার ক্ষমতা লেখককে কী রকম সাহস দিয়েছিল?
উত্তর: লেখক জানতেন ফারসি আফগানিস্তানের শিক্ষিত ও ভদ্র সমাজের ভাষা। তাই তিনি ভেবেছিলেন, যদি তিনি কাবুলিওয়ালাদের সঙ্গে ফারসিতে কথা বলেন, তবে তারা একজন বাঙালি বাবুর মুখে ফারসি শুনে অবাক হবে এবং তাঁকে সম্মান করে কামরায় জায়গা করে দেবে। এই ধারণা থেকেই তিনি সাহস পেয়েছিলেন।

৮.৩ 'আলেম' শব্দের মানে কী? লেখককে কারা, কেন 'এক মস্ত আলেম' ভেবেছিলেন?
উত্তর: 'আলেম' শব্দের মানে সর্বজ্ঞ বা বিদ্বান ব্যক্তি।
লেখকের সহযাত্রী পাঠানরা তাঁকে 'এক মস্ত আলেম' ভেবেছিল। কারণ লেখক তাদের দেশের কবি খুশ-হাল খাঁ খট্টক এবং লোককাহিনি 'আদম খাঁ ও দুরখানির কিসসা' সম্পর্কে জানতেন। লেখকের এই জ্ঞান দেখে তারা মুগ্ধ হয়েছিল এবং তাঁকে একজন বিদ্বান ব্যক্তি বলে মনে করেছিল।

৮.৪ আগা-সাহেব সম্বন্ধে যা জানা গেল, সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: আগা-সাহেব ছিলেন একজন বৃদ্ধ পাঠান। তাঁর ব্যবসার কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের বরিশালের پটুয়াখালিতে। তিনি সেখানে শীতবস্ত্র ও হিং বিক্রি করতেন এবং চাষিদের টাকা ধার দিতেন। তিনি বরিশালের ভাষা এতটাই ভালো বলতে পারতেন যে তা তাঁর মাতৃভাষার মতোই শোনাত।

৮.৫ লেখকের সামনের বেঞ্চির দুই পাঠান সহযাত্রী নিজেদের মধ্যে যে আলোচনা করছিলেন তা নিজের ভাষায় লেখো। লেখক কীভাবে সেই কথার অর্থ বুঝতে পারলেন?
উত্তর: পাঠান সহযাত্রীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল যে, এই বাঙালি বাবু খুব বিদ্বান ও বুদ্ধিমান। তিনি ইংরেজদের লেখা বই এবং ফারসি পড়ে তাদের দেশ ও গ্রাম্য বিষয় সম্পর্কেও অনেক খবর রাখেন।
লেখক পশতু ভাষা না বুঝলেও, ওই ভাষায় ব্যবহৃত প্রচুর ফারসি ও আরবি শব্দের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তাই উর্দু ভাষার জ্ঞানের সাহায্যে তিনি তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু বুঝতে পেরেছিলেন।

৯. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো:

৯.১ পাঠ্য গদ্যটির ভাবের সঙ্গে 'পথচলতি' নামটি কতখানি সংগতিপূর্ণ হয়েছে, বিচার করো।
উত্তর: 'পথচলতি' নামটি গদ্যাংশটির সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। 'পথচলতি' কথার অর্থ হল পথে চলতে চলতে। এই রচনাটি লেখকের একটি রেলযাত্রার অভিজ্ঞতার বর্ণনা, যেখানে পথের মধ্যেই কাবুলিওয়ালাদের সঙ্গে তাঁর ক্ষণিকের পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। যাত্রাপথের এই আকস্মিক ও চলমান ঘটনাই গল্পের মূল উপজীব্য, তাই এই নামকরণ অত্যন্ত সার্থক।

৯.২ পাঠ্য গদ্যাংশটি থেকে কথকের চরিত্রের কোন বৈশিষ্ট্যগুলি তোমার চোখে ধরা পড়েছে বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে লেখো।
উত্তর: কথক বা লেখকের চরিত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে:

  • সাহসিকতা: জবরদস্ত পাঠানদের দখল করা কামরায় একা উঠে পড়ার সিদ্ধান্ত তাঁর সাহসের পরিচয় দেয়।
  • বুদ্ধিমত্তা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব: ফারসি ভাষা প্রয়োগ করে কঠিন পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা তাঁর বুদ্ধির পরিচয়।
  • জ্ঞানপিপাসা ও সংস্কৃতিমনস্কতা: তিনি বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহী। পশতু কবি এবং লোককাহিনি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান এর প্রমাণ।
  • আন্তরিকতা: তিনি সহজেই ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন এবং তাদের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি দেখান।

৯.৩ কথকের সঙ্গে কাবুলিওয়ালাদের প্রারম্ভিক কথোপকথনটি সংক্ষেপে বিবৃত করো।
উত্তর: লেখক যখন কামরায় উঠতে যান, তখন পাঠানরা হিন্দিতে হুংকার দিয়ে তাঁকে বাধা দেয়। উত্তরে লেখক ফারসি ভাষায় শুধু একজনের জন্য একটু জায়গা চান। পাঠানরা প্রথমে অবাক হয়ে যায় এবং তাঁর কথা বুঝতে পারে না। তখন লেখক খানিকটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাদের ফারসি না জানা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এরপর দলের এক যুবক ফারসিতে উত্তর দিলে, লেখক তাঁর কলকাতা যাওয়ার কথা জানান। লেখকের ফারসি বলার ক্ষমতায় প্রভাবিত হয়ে তারা তাঁকে সম্মানের সঙ্গে পুরো একটি বেঞ্চি ছেড়ে দেয়।

৯.৪ কথক কেন বলেছেন 'যেন এক পশতু-সাহিত্য-গোষ্ঠী বা সম্মেলন লাগিয়ে দিলুম।'- সেই সাহিত্য সম্মেলনের বর্ণনা দাও।
উত্তর: লেখক এটি বলেছেন কারণ একটি চলন্ত ট্রেনের সাধারণ কামরা তখন পשতু সাহিত্য-চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
সেই সাহিত্য সম্মেলনে, লেখকের অনুরোধে একজন পাঠান কবি খুশ-হাল খাঁ খট্টকের লেখা পশতু গজল গেয়ে শোনান। এরপর অন্য একজন আদম খাঁ ও দুরখানির হৃদয়বিদারক লোককাহিনি বা কিসসা পাঠ করে শোনান। এই গান, পাঠ এবং আলোচনায় কামরার পরিবেশ এমন হয়ে উঠেছিল যেন এটি কোনো সাহিত্য সভা।

৯.৫ 'পথচলতি' রচনায় ভাষা ও সংস্কৃতির বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও যে সহজ বন্ধুত্ব ও উদার सहानुভূতির ছবিটি পাওয়া যায় তার স্বরূপ বিশ্লেষণ করো। বর্তমান সময়ে এই বন্ধুত্ব ও সহানুভূতির প্রাসঙ্গিকতা বুঝিয়ে দাও।
উত্তর: 'পথচলতি' রচনায় বাঙালি লেখক এবং পাঠান কাবুলিওয়ালাদের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির বিশাল পার্থক্য ছিল। কিন্তু লেখকের জ্ঞান, আন্তরিকতা এবং সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে সেই বাধা দূর হয়ে যায়। পাঠানরাও তাদের স্বভাবসিদ্ধ কাঠিন্য ভুলে লেখকের প্রতি বন্ধুত্ব ও সহানুভূতি দেখায়। তারা লেখককে নিজেদের দলেরই একজন হিসাবে গ্রহণ করে।
বর্তমান সময়ে, যখন ধর্ম, জাতি ও ভাষার ভেদাভেদ বাড়ছে, তখন এই গল্পটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদের শেখায় যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যেও সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

১০. রেলভ্রমণের সময় অচেনা মানুষের সঙ্গে তোমার বন্ধুত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি রম্যরচনা লেখো।

ট্রেনের জানালায় বন্ধুত্বের আকাশ
সেবার পূজার ছুটিতে আমরা যাচ্ছিলাম পুরী। ট্রেনের রিজার্ভেশন থাকলেও আমাদের কামরায় বেশ ভিড়। আমার জানালার ধারের সিটটা বেদখল হওয়ার ভয়ে আমি শক্ত করে বসেছিলাম। এমন সময় আমার বয়সী একটি ছেলে তার মায়ের সঙ্গে এসে ঠিক আমার উল্টোদিকের সিটে বসল। প্রথম কিছুক্ষণ আমরা দুজনেই জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম, যেন একে অপরের অস্তিত্বই নেই।
ট্রেন ছাড়ার পর মা আমাকে টিফিন বক্স থেকে লুচি আর আলুর দম বের করে দিলেন। ছেলেটি তখন একমনে একটা কমিকস পড়ছিল। আমি খেতে খেতে বললাম, "খাবি?"
সে এমনভাবে চমকে তাকাল, যেন আমি মঙ্গলগ্রহ থেকে কথা বলছি। তারপর লাজুক হেসে মাথা নাড়ল। কিন্তু তার মা বললেন, "নাও না বাবা, আন্টি দিচ্ছে।"
ব্যস, বন্ধুত্বের প্রথম লুচিটা ভাগ হতেই আমাদের জমানো কথাগুলোও যেন ট্রেনের মতো গতি পেল। ওর নাম আকাশ, আমাদের মতোই কলকাতায় থাকে। কথায় কথায় জানা গেল, আমরা দুজনেই ক্রিকেট ভালোবাসি, কিন্তু ওর পছন্দ ধোনি আর আমার কোহলি। এই নিয়ে একচোট তর্কও হয়ে গেল।
তারপর শুরু হলো আমাদের গল্পের ঝুলি খোলা। স্কুল, বন্ধু, দুষ্টুমি—কিছুই বাদ গেল না। একসময় আমরা ট্রেনের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। হু হু করে হাওয়া আসছে, আর সবুজ মাঠ, ছোট ছোট গ্রাম পেছনে ছুটে যাচ্ছে। আকাশ হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল, "কী মজা!" আমিও ওর সঙ্গে গলা মেলালাম। সেই ক্ষণিকের আনন্দ আর বন্ধুত্ব আমার পুরী ভ্রমণের থেকেও দামি এক স্মৃতি হয়ে রইল।

বিজ্ঞাপন