অষ্টম শ্রেণীর বাংলা সমাধান - পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি

WBBSE-র 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের "পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি" কবিতাটির সম্পূর্ণ সমাধান।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal

কবিতা: পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি

কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)


কবি পরিচিতি

Jibanananda Das

জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর জন্ম অধুনা বাংলাদেশের বরিশালে। তাঁর কবিতায় বাংলার প্রকৃতি ও নিসর্গ এক অপরূপ রূপে ধরা দিয়েছে। 'রূপসী বাংলা', 'বনলতা সেন', 'ধূসর পাণ্ডুলিপি', 'মহাপৃথিবী' তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। আলোচ্য কবিতাটি তাঁর 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

কবিতার সারসংক্ষেপ

'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ গ্রাম বাংলার এক অলস দুপুরের ছবি এঁকেছেন। এই দুপুরে রোদের মধ্যে স্বপনের মতো এক গন্ধ ভেসে বেড়ায়। কবি মনে করেন, এই দুপুরের কাহিনি বা স্বপ্ন কেউ জানে না, কেবল প্রান্তরের শঙ্খচিল তা জানে। এই বিষণ্ণ দুপুরে কবি এক বেদনা অনুভব করেন, যা শুকনো পাতা, শালিকের স্বর এবং নকশাপাড়ের শাড়িখানা পরা মেয়েটির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। হলুদ পাতার মতো ঝরে যাওয়া স্বপ্ন, জলসিড়ি নদীর পাশে ভাঁটফুল, শটিবন—সব মিলিয়ে এক বিষণ্ণতার সুর তৈরি হয়। হাঁসেরা জলে ভিজে খেলা করে, কিন্তু অতীত যেন আর ফেরে না। এই সব মিলিয়েই কবি পাড়াগাঁর এই দুপুরকে ভালোবাসেন, যার মধ্যে এক ভিজে বেদনা মিশে আছে এবং যা কবিকে আকুল করে তোলে।

শব্দার্থ

দু-পহর: দ্বিপ্রহর, দুপুরবেলা। শঙ্খচিল: ধবল ডানাবিশিষ্ট চিল। জলসিড়ি: বাংলাদেশের একটি নদীর নাম। শটিবন: আদা গোত্রীয় বুনো গাছের জঙ্গল।


অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর

১. কবি পরিচিতি

১.১ জীবনানন্দ দাশের লেখা দুটি কবিতার বইয়ের নাম লেখো।
উত্তর: জীবনানন্দ দাশের লেখা দুটি কবিতার বইয়ের নাম হলো 'রূপসী বাংলা' এবং 'বনলতা সেন'!

১.২ তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম কী?
উত্তর: তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম 'ঝরা পালক' (১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত)।

২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও:

২.১ 'দু-পহর' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'দু-পহর' শব্দের অর্থ হলো দ্বিপ্রহর বা দুপুরবেলা।

২.২ 'কেবল প্রান্তর জানে তাহা' — 'প্রান্তর' কী জানে?
উত্তর: প্রান্তর দুপুরের স্বপ্ন এবং কাহিনির কথা জানে।

২.৩ 'তাহাদের কাছে যেন এ জনমে নয় — যেন ঢের যুগ ধরে কথা শিখিয়াছে এ হৃদয়' — কাদের কথা এখানে বলা হয়েছে?
উত্তর: এখানে প্রান্তরের শঙ্খচিলের কথা বলা হয়েছে।

২.৪ 'জলসিড়িটির পাশে ঘাসে ...' — কী দেখা যায়?
উত্তর: জলসিড়ি নদীর পাশে হলুদ পাতার মতো ঝরে যাওয়া স্বপ্ন দেখা যায়।

২.৫ 'জলে তার মুখখানা দেখা যায়...' — জলে কার মুখ দেখা যায়?
উত্তর: জলে শ্যাওলা-ধুমো হাঁসের মুখখানা দেখা যায়।

২.৬ 'ভিডিও ভাসিছে কার জলে...' — ডিঙিটি কেমন?
উত্তর: ডিঙিটি ছেঁড়া ও ফাটা।

২.৭ ডিঙিটি কোথায় বাঁধা রয়েছে?
উত্তর: ডিঙিটি হিজলের ডালে বাঁধা রয়েছে।

৩. নীচের প্রশ্নগুলির কয়েকটি বাক্যে উত্তর দাও:

৩.১ পাড়াগাঁর দ্বিপ্রহরকে কবি ভালোবাসেন কেন?
উত্তর: পাড়াগাঁর দ্বিপ্রহরে এক রহস্যময়, স্বপ্নালু পরিবেশ তৈরি হয়। রোদের মধ্যে স্বপ্নের গন্ধ, শঙ্খচিলের আনাগোনা, শুকনো পাতার বিষণ্ণতা—এই সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত বেদনা ও নস্টালজিয়া কবিকে আচ্ছন্ন করে। এই বিষণ্ণ সৌন্দর্যের জন্যই কবি পাড়াগাঁর দুপুরকে ভালোবাসেন।

৩.২ 'স্বপ্নে যে-বেদনা আছে' — কবির স্বপ্নে কোন বেদনার অনুভূতি?
উত্তর: কবির স্বপ্নে যে বেদনা আছে, তা হলো প্রকৃতির নানা উপাদানের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বিষণ্ণতার অনুভূতি। শুকনো পাতা, শালিকের ডাক, নকশাপাড়ের শাড়ি পরা একাকিনী মেয়ে, হলুদ পাতার মতো ঝরে যাওয়া স্বপ্ন—এই সবকিছু কবির মনে এক গভীর বিষণ্ণতা ও হারানোর বেদনা জাগিয়ে তোলে।

৩.৩ প্রকৃতির কেমন ছবি কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।
উত্তর: কবিতাটিতে বাংলার এক শান্ত, বিষণ্ণ দুপুরের ছবি ফুটে উঠেছে। এখানে আছে নির্জন প্রান্তর, উড়ন্ত শঙ্খচিল, শুকনো পাতা, শালিকের ডাক, জলসিড়ি নদী এবং তার পাশে শটিবন। ছেঁড়া-ফাটা ডিঙি, জলে ভাসা হাঁস—এইসব চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি এক ক্ষয়িষ্ণু কিন্তু মায়াময় প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন, যা পাঠকের মনে গভীর ছাপ ফেলে।

৩.৪ 'কেঁদে-কেঁদে ভাসিতেছে আকাশের তলে' — কবির এমন মনে হওয়ার কারণ কী বলে তোমার মনে হয়?
উত্তর: আমার মনে হয়, পাড়াগাঁর দুপুরের নিস্তব্ধ ও বিষণ্ণ প্রকৃতি কবির মনে এক গভীর বেদনা জাগিয়ে তুলেছে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান—শুকনো পাতা, শালিকের ডাক, ঝরে পড়া হলুদ পাতা—সবকিছুর মধ্যেই কবি এক ধরনের হারানোর কষ্ট অনুভব করেছেন। এই সামগ্রিক বিষণ্ণতার অনুভূতি থেকেই তাঁর মনে হয়েছে, প্রকৃতি যেন আকাশের তলে কেঁদে কেঁদে ভাসছে।

৪. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো:

৪.১ 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি ...' শীর্ষক কবিতাটি 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের কতসংখ্যক কবিতা? 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' কবিতায় কবি জীবনানন্দের কবি-মানসিকতার পরিচয় কীভাবে ধরা দিয়েছে, তা বুঝিয়ে দাও।
উত্তর: 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' কবিতাটি 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের ৬ নম্বর কবিতা।
এই কবিতায় কবি জীবনানন্দের কবি-মানসিকতার গভীর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বাংলার তুচ্ছ, সাধারণ প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যেও এক অসাধারণ সৌন্দর্য ও বিষণ্ণতা খুঁজে পেয়েছেন। পাড়াগাঁর দুপুরের অলস, স্বপ্নময় পরিবেশ তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। শঙ্খচিল, শুকনো পাতা, শালিক, জলসিড়ি নদী—এইসব সাধারণ চিত্রকল্পের মাধ্যমে তিনি জীবনের ক্ষয়, বিষাদ এবং হারানো দিনের জন্য এক গভীর আর্তি প্রকাশ করেছেন। প্রকৃতির সঙ্গে কবির একাত্ম হয়ে যাওয়ার এই প্রবণতাই তাঁর কবি-মানসের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

৪.২ কবিতাটির গঠন-প্রকৌশল আলোচনা করো।
উত্তর: কবিতাটি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা, যার দুটি অংশ—অষ্টক ও ষটক। প্রথম আট চরণে (অষ্টক) কবি পাড়াগাঁর দুপুরের বিষণ্ণ প্রকৃতির একটি চিত্র তুলে ধরেছেন, যেখানে বেদনা ও রহস্যময়তা মিশে আছে। শেষ ছয় চরণে (ষটক) কবি সেই প্রকৃতির গভীরে প্রবেশ করে নিজের অনুভূতি ও দার্শনিক চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এখানে প্রকৃতির বিষণ্ণতার সঙ্গে কবির মনের বেদনা একাত্ম হয়ে গেছে। কবিতাটির অন্ত্যমিল (কখখক কখখক, গঘগ ঘগঘ) এবং চিত্রকল্পের ব্যবহার এর গঠনকে আরও সুন্দর ও সংহত করেছে।

৪.৩ 'গন্ধ লেগে আছে রৌদ্রে যেন ভিজে বেদনার' — কবিতায় কীভাবে এই অপরূপ বিষণ্ণতার স্তর এসে লেগেছে, তা যথাযথ পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে আলোচনা করো।
উত্তর: কবিতাটির পরতে পরতে এক অপরূপ বিষণ্ণতার সুর লেগে আছে। কবি শুরুতেই বলেছেন, "রৌদ্রে যেন গন্ধ লেগে আছে স্বপনের"। এই স্বপ্নময় গন্ধের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক "ভিজে বেদনা"। এই বেদনা আরও গভীর হয়েছে যখন কবি বলেন, "এ হৃদয়—স্বপ্নে যে-বেদনা আছে: শুধু পাতা—শালিকের স্বর"। প্রকৃতির এই ছোট ছোট অনুষঙ্গ কবির হৃদয়ের বিষণ্ণতাকে জাগিয়ে তোলে। নকশাপেড়ে শাড়ি পরা মেয়েটির চলে যাওয়া, "হলুদ পাতার মতো ভেসে যায়, জলসিড়িটির পাশে ঘাসে" পড়ে থাকা স্বপ্ন—এইসব চিত্রকল্প বিষণ্ণতাকে আরও ঘনীভূত করে। শেষ পর্যন্ত, "কেঁদে-কেঁদে ভাসিতেছে আকাশের তলে" পঙ্‌ক্তিটির মাধ্যমে এই বিষণ্ণতা প্রকৃতির কান্না হয়ে সমগ্র কবিতায় ছড়িয়ে পড়ে।

৫. নীচের শব্দগুলির ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচার করো:

পাড়াগাঁর: পাড়া + গাঁ + এর (সন্ধি ও বিভক্তি যোগ)

দু-পহর: দ্বিপ্রহর > দুপহর > দু-পহর (স্বরলোপ ও সমীভবন)

স্বপন: স্বপ্ন > স্বপন (স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ)

জনম: জন্ম > জনম (স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ)

ভিজে: ভিজা > ভিজে (স্বরসংগতি)

৬. নীচের শব্দগুলির ব্যাসবাক্যসহ সমাসের নাম লেখো:

শঙ্খচিল: শঙ্খের ন্যায় ধবল যে চিল - উপমান কর্মধারয় সমাস।

নকশাপেড়ে: নকশা যে পেড়ে - মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস।

জলসিড়ি: জলসিড়ি নামক নদী - মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস।

শটিবন: শটির বন - ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস।

৭. নীচের বাক্যগুলিতে ক্রিয়ার কাল নির্ণয় করো:

৭.১ পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি— (সাধারণ বর্তমান কাল)

৭.২ রৌদ্রে যেন গন্ধ লেগে আছে স্বপনের— (পুরাঘটিত বর্তমান কাল)

৭.৩ শ্যাওলা নুয়ে আছে বহুদিন ছন্দহীন বুড়ো জালটার; (পুরাঘটিত বর্তমান কাল)

৭.৪ ডিঙিও ভাসিছে কার জলে, ... (ঘটমান বর্তমান কাল)

৭.৫ কোনোদিন এই দিকে আসিবে না আর, ... (সাধারণ ভবিষ্যৎ কাল)