অষ্টম শ্রেণীর বাংলা সমাধান - গড়াই নদীর তীরে

WBBSE-র 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের "গড়াই নদীর তীরে" কবিতাটির সম্পূর্ণ সমাধান।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal

কবিতা: গড়াই নদীর তীরে

কবির নাম: জসীমউদ্দীন (১৯০৪-১৯৭৬)


কবি পরিচিতি

Jasuddin

জসীমউদ্দীন 'পল্লিকবি' হিসেবে বাংলা সাহিত্যে খ্যাত। তাঁর জন্ম অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুরে। গ্রাম বাংলার সহজ-সরল জীবনযাত্রা, প্রকৃতি ও মানুষের সুখ-দুঃখ তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। 'নকশী কাঁথার মাঠ', 'রাখালী', 'বালুচর', 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। আলোচ্য কবিতাটি তাঁর 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

কবিতার সারসংক্ষেপ

'গড়াই নদীর তীরে' কবিতাটিতে কবি এক গ্রাম্য কুটিরের মনোরম চিত্র এঁকেছেন। কুটিরখানি লতাপাতা ও ফুলে ঘেরা। তার উঠোনে মাচানের উপর শিম-লতা, লাউ-কুমড়োর ঝাড় দেখা যায়। লালশাকের খেতে লাল রঙের ঢেউ খেলে যায়। মাঝে মাঝে সেখান থেকে নতুন বউ ছোট ছোট চারা তুলে নেয়। মেয়েরা এসে গল্প করে, পাখিরা গান গায়। উঠোনে মটরের ডাল, মসুরের ডাল শুকোতে দেওয়া হয়। জিরা, ধনে ও মরিচের গন্ধে চারিদিক ম-ম করে। কবি মনে করেন, এই সাধারণ দৃশ্যগুলির মধ্যেই সুখের কাহিনি লুকিয়ে আছে। এই বাড়িটি যেন আনন্দ আর হাসিতে ভরা এক জীবন্ত ছবি, যা কবিকে ভালোবেসে কাছে টানে।

শব্দার্থ

মাচান: বাঁশ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি উঁচু বেদি বা মঞ্চ। এঁদো ডোবা: নোংরা ও পঙ্কিল জলাশয়। হেথায়: এখানে। আখঁর: অক্ষর, বর্ণ।


অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর

১. কবি পরিচিতি

১.১ কবি জসীমউদ্দীন কোন অভিধায় অভিহিত?
উত্তর: কবি জসীমউদ্দীন 'পল্লিকবি' অভিধায় অভিহিত।

১.২ তাঁর লেখা দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম লেখো।
উত্তর: তাঁর লেখা দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম হলো 'নকশী কাঁথার মাঠ' এবং 'সোজন বাদিয়ার ঘাট'!

২. একটি বাক্যে উত্তর দাও:

২.১ কবিতায় বর্ণিত নদীটির নাম কী?
উত্তর: কবিতায় বর্ণিত নদীটির নাম গড়াই নদী।

২.২ মাচানের পরে কী আছে?
উত্তর: মাচানের পরে শিম-লতা আর লাউ-কুমড়োর ঝাড় আছে।

২.৩ মানুষের বাস করার কথা এখানে কারা বোঝেনি?
উত্তর: গাছের শাখায় বনের পাখিরা মানুষের বাস করার কথা বোঝেনি।

২.৪ উঠানেতে কী শুকচ্ছে?
উত্তর: উঠানেতে লংকা-মরিচ, মটরের ডাল, মসুরের ডাল শুকোতে দেওয়া হয়েছে।

২.৫ বাড়িটিকে ভালবেসে কারা বেড়াতে এলে কিছুক্ষণ থেমে রয়?
উত্তর: সাঁঝ-সকালের রঙিন মেয়েরা (মেঘেরা) বেড়াতে এলে বাড়িটিকে ভালোবেসে কিছুক্ষণ থেমে রয়।

৩. নীচের প্রশ্নগুলির কয়েকটি বাক্যে উত্তর দাও:

৩.১ 'কুটিরখানিরে লতাপাতা ফুল মায়ায় রয়েছে ঘিরে' — এখানে কুটিরটিকে লতাপাতা-ফুলের মায়া দিয়ে ঘিরে রাখার বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: এই পঙ্‌ক্তিটির মাধ্যমে কবি বুঝিয়েছেন যে, গড়াই নদীর তীরের কুটিরটি লতাপাতা ও ফুলে এমনভাবে আবৃত হয়ে আছে, যেন প্রকৃতি পরম মমতায় তাকে আগলে রেখেছে। এই মায়ার বাঁধন কুটিরটিকে এক জীবন্ত সত্তা দান করেছে।

৩.২ 'ডাহুক মেয়েরা বেড়াইতে আসে গানে গানে কথা কয়ে' — 'ডাহুক মেয়ে' কারা? তারা কাদের নিয়ে আসে? তারা কীভাবে কথা বলে?
উত্তর: এখানে 'ডাহুক মেয়ে' বলতে গ্রামের মেয়েদের বোঝানো হয়েছে। তারা সঙ্গীদের নিয়ে কুটিরের আঙিনায় বেড়াতে আসে। তারা গানের সুরে সুরে নিজেদের মধ্যে কথা বলে।

৩.৩ 'যেন একখানি সুখের কাহিনি নানান আখরে ভরি' — 'আখর' শব্দটির অর্থ কী? সুখের কাহিনির যে নানা ছবি কবি এঁকেছেন তার মধ্যে কোনটি তোমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে এবং কেন?
উত্তর: 'আখর' শব্দটির অর্থ হলো অক্ষর বা বর্ণ।
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে "লাল শাড়ি évaluation রোদে দিয়ে গেছে এ বাড়ির বধূ কেউ" – এই ছবিটি। কারণ এই একটি মাত্র চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি এক নিস্তরঙ্গ গ্রাম্য দুপুরে এক নববধূর অস্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা এক শান্ত ও মধুর পারিবারিক সুখের ইঙ্গিত দেয়।

৩.৪ 'কিছুখন যেন থামিয়া রয়েছে এ বাড়িরে ভালোবেসে' — রঙিন মেয়েরা বাড়িটিকে ভালোবেসে থেমে থাকে। এর মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: এখানে 'রঙিন মেয়েরা' বলতে সকাল-সন্ধ্যার মেঘেদের বোঝানো হয়েছে। কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, কুটিরটির সৌন্দর্য এতই মনোগ্রাহী যে, আকাশের মেঘেরা চলার পথে থমকে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখে। প্রকৃতির জড় উপাদানের মধ্যেও কবি এখানে প্রাণের আরোপ করেছেন।

৪. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো:

৪.১ 'এ বাড়ির যত আনন্দ হাসি আঁকা জীবন্ত করি' — কবিতায় কবি প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম যে গ্রামীণ কুটিরের জীবন্ত ছবি এঁকেছেন তার বিবরণ দাও।
উত্তর: 'গড়াই নদীর তীরে' কবিতায় কবি এক শান্ত, স্নিগ্ধ গ্রামীণ কুটিরের ছবি এঁকেছেন যা প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কুটিরটি লতাপাতা ও ফুলে ঘেরা। উঠোনের মাচানে লাউ-কুমড়ো ফলে আছে, বাতাসে দুলছে ফুল। লালশাকের খেত, তাতে নতুন বউয়ের হাতের ছোঁয়া, মেয়েদের আসা-যাওয়া, পাখিদের গান—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। উঠোনে শুকোতে দেওয়া ডাল, মশলার গন্ধ—সবকিছুই এক সুখী, কর্মব্যস্ত পরিবারের ইঙ্গিত দেয়। আকাশের মেঘেরাও যেন এই বাড়ির সৌন্দর্যে মুগ্ধ। এভাবেই কবি এক সাধারণ কুটিরকে প্রকৃতির অংশ করে এক জীবন্ত রূপ দিয়েছেন।

৪.২ 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' কবিতায় কবি পরম মমতায় গ্রামীণ কুটিরের ছবি এঁকেছেন। আমাদের প্রত্যেকেরই নিজের বাড়ি নিয়ে এমন একটি মমতার সম্পর্ক আছে। তুমি তোমার বাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বিবরণ দিয়ে একটি অনুচ্ছেদ লেখো।
উত্তর: আমার বাড়ি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। এখানে প্রতিটি উৎসব খুব আনন্দ আর মমতার সাথে পালিত হয়। যেমন, দুর্গাপূজার সময় আমাদের বাড়ি আলোয় সেজে ওঠে। আত্মীয়-স্বজনদের আগমনে বাড়িটা উৎসবে মুখর হয়ে থাকে। সবাই মিলে একসাথে ঠাকুর দেখতে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া আর আড্ডায় দিনগুলো কেটে যায়। আবার সরস্বতী পূজার দিন সকালে অঞ্জলি দেওয়া, তারপর সারাটা দিন বন্ধুদের সাথে কাটানো—এইসব স্মৃতিগুলো খুব মধুর। জন্মদিনে মা পায়েস রান্না করেন, বাবা নতুন জামা এনে দেন। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আমার বাড়িকে আমার কাছে একটা ভালোবাসার জায়গা করে তুলেছে।

৫. নীচের বাক্যগুলিতে ক্রিয়ার কাল নির্ণয় করো:

৫.১ কুটিরখানিরে লতাপাতা ফুল মায়ায় রয়েছে ঘিরে। (পুরাঘটিত বর্তমান কাল)

৫.২ উঠানের কোণে বুনো ফুলগুলি হেসে হয় কুটি কুটি। (সাধারণ বর্তমান কাল)

৫.৩ লংকা-মরিচ রোদে শুকাইছে উঠানেতে সযতনে। (ঘটমান বর্তমান কাল)

৫.৪ জিরা ও ধনের রঙের পাশেতে আলপনা আঁকা কার! (সাধারণ বর্তমান কাল)

৫.৫ কিছুখন যেন থামিয়া রয়েছে এ বাড়িরে ভালোবেসে। (পুরাঘটিত বর্তমান কাল)

৬. নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন করো:

৬.১ লাল শাড়িখানি রোদে দিয়ে গেছে এ বাড়ির বধূ কেউ। (জটিল বাক্যে)
উত্তর: যে লাল শাড়িখানি রোদে দেওয়া, সেটি এ বাড়ির কোনো বধূ দিয়ে গেছে।

৬.২ ডাহুক মেয়েরা বেড়াইতে আসে গানে গানে কথা কয়ে। (চলিত গদ্যে)
উত্তর: ডাহুক মেয়েরা বেড়াতে এসে গানে গানে কথা বলে।

৬.৩ গাছের শাখায় বনের পাখিরা নির্ভয়ে গান ধরে। (না-সূচক বাক্যে)
উত্তর: গাছের শাখায় বনের পাখিদের গান ধরতে ভয় নেই।

৬.৪ এখনো তাহারা বোঝেনি হেথায় মানুষ বাস করে। (প্রশ্নবোধক বাক্যে)
উত্তর: এখনো কি তাহারা বোঝেনি হেথায় মানুষ বাস করে?

৭. নীচের শব্দগুলির ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচার করো:

কুমড়া: কুষ্মাণ্ড > কুম্মণ্ড > কুমড়ো > কুমড়া (স্বরভক্তি, সমীভবন)

কালিজিরা: কাল + জিরা (সন্ধি)

উঠান: উত্থান > উঠান (ধ্বনি পরিবর্তন)

সযতনে: স + যত্ন + এ (উপসর্গ ও বিভক্তি যোগ)

আখর: অক্ষর > আখর (স্বরভক্তি ও ঘোষীভবন)

সাঁঝ: সন্ধ্যা > সঞ্ঝা > সাঁঝ (নাসিক্যীভবন ও স্বরলোপ)

৮. কারক-বিভক্তি নির্ণয় করো:

৮.১ গড়াই নদীর তীরে: সম্বন্ধ পদে 'র' বিভক্তি।

৮.২ উঠানের কোণে বুনো ফুলগুলি হেসে হয় কুটি কুটি: সম্বন্ধ পদে 'এর' বিভক্তি।

৮.৩ গাছের শাখায় বনের পাখিরা নির্ভয়ে গান ধরে: সম্বন্ধ পদে 'এর' বিভক্তি।

৮.৪ যেন একখানি সুখের কাহিনি নানান আখরে ভরি: করণ কারকে 'এ' বিভক্তি।

৮.৫ সাঁঝ-সকালের রঙিন মেয়েরা এখানে বেড়াতে এসে: কর্তৃকারকে 'রা' বিভক্তি।

৯. নীচের শব্দগুলির মধ্যে কোনটি কোন শ্রেণির বিশেষ্য তা নির্দেশ করো:

মানুষ: জাতিবাচক বিশেষ্য

আনন্দ: গুণবাচক বিশেষ্য

ফুলগুলি: জাতিবাচক বিশেষ্য (সমষ্টিবাচকও বলা যায়)

আলপনা: বস্তুবাচক বিশেষ্য

১০. নীচের শব্দগুলির মধ্যে কোনটি কোন শ্রেণির সর্বনাম তা নির্দেশ করো:

যার: সাপেক্ষ সর্বনাম

কার: প্রশ্নবাচক সর্বনাম

তাহারা: ব্যক্তিবাচক সর্বনাম

কেউ: অনির্দেশক সর্বনাম

তার: নির্দেশক সর্বনাম

১১. এঁদো, লাল, বুনো, রঙিন — বিশেষণগুলির সাহায্যে নতুন শব্দবন্ধ তৈরি করো।

এঁদো: এঁদো পুকুর

লাল: লাল শাড়ি

বুনো: বুনো ফুল

রঙিন: রঙিন মেঘ