অষ্টম শ্রেণীর বাংলা সমাধান - একটি চড়ুই পাখি

WBBSE-র 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের "একটি চড়ুই পাখি" কবিতার সম্পূর্ণ সমাধান।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
বিজ্ঞাপন

কবিতা: একটি চড়ুই পাখি

কবি: তারাপদ রায়


কবি সম্পর্কে আলোচনা

তারাপদ রায় (১৯৩৬ – ২০০৭): তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি ও রম্যরচনাকার। তাঁর কবিতায় সাধারণ জীবনের ছবি, কৌতুক এবং গভীর অনুভূতি মিশে থাকত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে 'তোমার প্রতিমা', 'নীল দিগন্তে এখন ম্যাজিক', 'কোথায় যাচ্ছেন তারাপদবাবু', 'দারিদ্র্যরেখা' ইত্যাদি। বাংলা শিশুসাহিত্যেও তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

Tarapada Roy

কবিতার সারসংক্ষেপ

'একটি চড়ুই পাখি' কবিতায় কবি তারাপদ রায় এক নিঃসঙ্গ মানুষের জীবনের ছবি এঁকেছেন। এক চড়ুই পাখি কবির নির্জন ঘরে এসে বাসা বেঁধেছে। সে রোজ সন্ধ্যায় ফিরে আসে, ঘরের ভাঙা কাঁচ, ভাঙা টেবিল, ফুলদানি, বই-খাতা সবকিছুকে নিজের বলে মনে করে। পাখিটি কবির নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সঙ্গী।

কবি অনুভব করেন যে, এই বাড়িটি শুধু তাঁর নয়, পাখিটিরও। তাদের দুজনের মধ্যে এক নীরব মায়ার বন্ধন তৈরি হয়েছে। কবির ইচ্ছা করে, তিনি যদি এই বাড়ি ছেড়ে চলেও যান, পাখিটি যেন এখানেই থেকে যায়। কারণ এই নির্জন রাতে কবি এবং পাখিটি দুজনেই একা, একে অপরের সঙ্গী।


চড়ুই এক ঘুরে ফিরে আমার ঘরেই
বাসা বাঁধে। অন্ধকার ঠোঁটে নিয়ে সন্ধ্যা ফেরে যেই
সে’ও ফেরে; এ বাড়ির খড় কুটো, এ বাড়ির ম্লান
ছেঁড়া শব্দের টুকরো, ঘর জুড়ে কিচিমিচি গান।
কখনো সে কাছাকাছি কৌতুহলী দুই চোখ মেলে
অবাক দৃষ্টিতে দেখে— হয়তো ভাবে লোকটা চলে গেলে
এই ঘর জানালা দোর, টেবিল ফুলদানি, বই-খাতা
এ সব আমার-ই হবে; আমাকেই দেবেন বিধাতা।
আবার কার্নিশে বসে চাহনিতে তাচ্ছিল্য মজার,
ভাবটা যেন—এই বাজে ঘরে আছি নিতান্ত মায়ার
শরীর আমার তাই। ইচ্ছে হলে আজই যেতে পারি
এ পাড়ায়-ও পাড়ায় পালেদের বোসেদের বাড়ি।
তবুও যায় না চলে এতটুকু দয়া করে পাখি
রাত্রির নির্জন ঘরে আমি আর চড়ুই একাকী।

অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর (হাতে কলমে)

১. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

১.১ তারাপদ রায় কত খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: তারাপদ রায় ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।

১.২ তাঁর রচিত দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম লেখো।
উত্তর: তাঁর রচিত দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম 'তোমার প্রতিমা' এবং 'নীল দিগন্তে এখন ম্যাজিক'।

২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর লেখো:

২.১ কবিতায় চড়ুই পাখিটিকে কোথায় বাসা বাঁধতে দেখা যায়?
উত্তর: কবিতায় চড়ুই পাখিটিকে কবির ঘরে বাসা বাঁধতে দেখা যায়।

২.২ চড়ুই পাখি এখান-সেখান থেকে কী সংগ্রহ করে আনে?
উত্তর: চড়ুই পাখি এখান-সেখান থেকে বাড়ির খড়কুটো এবং ছেঁড়া শব্দের টুকরো সংগ্রহ করে আনে।

২.৩ কবির ঘরে কোন কোন জিনিস চড়ুই পাখিটির চোখে পড়ে?
উত্তর: কবির ঘরে জানালা, দরজা, টেবিল, ফুলদানি, বই-খাতা ইত্যাদি জিনিস চড়ুই পাখিটির চোখে পড়ে।

২.৪ ইচ্ছে হলেই চড়ুই-পাখি কোথায় চলে যেতে পারে?
উত্তর: ইচ্ছে হলেই চড়ুই-পাখি এ পাড়ায়-ও পাড়ায় পালেদের বা বোসেদের বাড়ি চলে যেতে পারে।

৩. নীচের প্রশ্নগুলির কয়েকটি বাক্যে উত্তর লেখো:

৩.১ ‘চড়ুই এক ঘুরে ফিরে আমার ঘরেই বাসা বাঁধে।’ — চড়ুই পাখিকে এখানে ‘চড়ুই’ বলা হলো কেন?
উত্তর: এখানে 'চড়ুই' শব্দটি ব্যবহার করে কবি পাখিটির প্রতি এক ধরনের স্নেহ ও ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করেছেন। এটি পাখিটিকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের বদলে আরও আপন ও সাধারণ করে তুলেছে, যা কবির একাকিত্বের সঙ্গী।

৩.২ কবিতায় বিধৃত চরিত্রগুলির দৃষ্টান্তসহ আলোচনা করো।
উত্তর: কবিতায় দুটি প্রধান চরিত্র রয়েছে—কবি নিজে এবং চড়ুই পাখিটি। কবি একজন নিঃসঙ্গ, সংবেদনশীল মানুষ, যিনি তাঁর নির্জন জীবনে পাখিটির সঙ্গ উপভোগ করেন। অন্যদিকে, চড়ুই পাখিটি চঞ্চল, কৌতুহলী এবং কবির ঘরের উপর যেন তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

৩.৩ ‘হয়তো ভাবে...’—চড়ুই পাখি কী ভাবে বলে কবি মনে করেন?
উত্তর: কবি মনে করেন, চড়ুই পাখিটি হয়তো ভাবে যে, এই একা মানুষটি (কবি) চলে গেলে তার ঘরের জানালা, দরজা, টেবিল, ফুলদানি, বই-খাতা সবকিছুই তার নিজের হয়ে যাবে।

৩.৪ ‘আবার কার্নিশে বসে চাহনিতে তাচ্ছিল্য মজার,...’ — তাচ্ছিল্যের মজার চাহনিতে তাকিয়ে চড়ুই কী ভাবে?
উত্তর: তাচ্ছিল্যের মজার চাহনিতে তাকিয়ে চড়ুই পাখিটি ভাবে যে, সে নিতান্ত মায়ার টানেই এই বাজে ঘরে আছে। নইলে ইচ্ছে হলেই সে অন্য কোথাও, যেমন পালেদের বা বোসেদের ভালো বাড়িতে চলে যেতে পারত।

৩.৫ ‘চড়ুই পাখিকে কেন্দ্র করে কবির ভাবনা কীভাবে আবর্তিত হয়েছে, তা কবিতা অনুসারে আলোচনা করো।
উত্তর: কবি চড়ুই পাখিটিকে তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছেন। পাখিটির কার্যকলাপের মাধ্যমে কবি নিজের একাকিত্ব, মায়া এবং জীবনের প্রতি এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। পাখিটি শুধু একটি প্রাণী নয়, কবির ভাবনার জগতে সে এক জীবন্ত চরিত্র।

৩.৬ ‘তবুও যায় না চলে এতটুকু দয়া করে পাখি’ — পঙ্‌ক্তিটিতে কবিমানসিকতার কীরূপ প্রতিফলন লক্ষ করা যায়?
উত্তর: এই পঙক্তিটিতে কবির গভীর একাকিত্ব এবং পাখিটির প্রতি তাঁর নির্ভরতার মনোভাব ফুটে উঠেছে। তিনি মনে করছেন, পাখিটি যেন তাঁকে 'দয়া' করে সঙ্গ দিচ্ছে। এটি কবির অসহায় এবং নিঃসঙ্গ মানসিকতারই প্রতিফলন।

৩.৭ ছোট্ট চড়ুই পাখির জীবনউন্ড কবিতার ক্ষুদ্র পরিসরে আঁকা হয়েছে তার পরিচয় দাও।
উত্তর: ছোট্ট চড়ুই পাখিটি কবির নির্জন ঘরের একমাত্র সঙ্গী। সে চঞ্চল, কৌতুহলী এবং খানিকটা অভিমানী। সে কবির ঘরকে নিজের বলে মনে করে, আবার ইচ্ছে হলে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার ভাবনাও ভাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মায়ার টানে সে কবির পাশেই থেকে যায়, তাঁর একাকিত্ব দূর করে।

৩.৮ ‘কৌতূহলী দুই চোখ মেলে অবাক দৃষ্টিতে দেখে’ — চড়ুইপাখির চোখ ‘কৌতূহলী’ কেন? তার চোখে কবির সংসারের কোন চালচিত্র ধরা পড়ে?
উত্তর: চড়ুইপাখির চোখ ‘কৌতূহলী’ কারণ সে কবির একাকী জীবন এবং তাঁর পারিপার্শ্বিক জগৎকে বোঝার চেষ্টা করে। তার চোখে কবির সংসারের যে চালচিত্র ধরা পড়ে, তা হল—একটি নির্জন ঘর, ভাঙা আসবাব, টেবিল, ফুলদানি এবং বই-খাতা, যা এক নিঃসঙ্গ মানুষের জীবনযাত্রার পরিচয় দেয়।

৩.৯ ‘রাত্রির নির্জন ঘরে আমি আর চড়ুই একাকী।’ — পঙ্‌ক্তিটিতে ‘একাকী’ শব্দটি প্রয়োগের সার্থকতা বুঝিয়ে দাও।
উত্তর: 'একাকী' শব্দটি এখানে অত্যন্ত সার্থক। এটি শুধু কবি এবং পাখিটির শারীরিক উপস্থিতিকে বোঝায় না, বরং তাদের মানসিক অবস্থাকেও তুলে ধরে। দুজনেই এই বিশাল পৃথিবীতে একা, এবং এই একাকিত্বই তাদের মধ্যে এক গভীর, নীরব বন্ধন তৈরি করেছে। তাই শব্দটি এখানে দুজনের مشترکہ নিঃসঙ্গতাকে প্রকাশ করে।

৩.১০ ‘একটি চড়ুই পাখি’ ছাড়া কবিতাটির অন্য কোনো নামকরণ করো। কেন তুমি এমন নাম দিতে চাও, তা বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: কবিতাটির অন্য একটি নাম হতে পারে 'নির্জন ঘরের সঙ্গী'
কারণ, এই কবিতায় চড়ুই পাখিটি কেবল একটি পাখি নয়, সে কবির নির্জন ঘরের একমাত্র সঙ্গী। কবির একাকিত্ব, তাঁর ভাবনা—সবকিছুই এই পাখিটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাই এই নামটি কবিতার মূল ভাবকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে।

৪. শব্দার্থ লেখো:

কার্নিশ: ছাদ বা দেওয়ালের বাইরে বেরিয়ে থাকা অংশ।

চাহনি: নজর / দৃষ্টিপাত।

তাচ্ছিল্য: অবজ্ঞা/অবহেলা।

৫. নীচের শব্দগুলির প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয় করো:

সন্ধ্যা: सम् (উপসর্গ) + √ধ্যৈ + অ + আ।

কৌতূহলী: কৌতূহল + ঈ (ইন)।

দৃষ্টি: √দৃশ্ + তি।

৬. নীচের বাক্যগুলির ক্রিয়ার কাল নির্ণয় করো:

৬.১ চড়ুই এক ঘুরে ফিরে আমার ঘরেই বাসা বাঁধে। - সাধারণ বর্তমান কাল।

৬.২ বই-খাতা এসব আমার-ই হবে। - সাধারণ ভবিষ্যৎ কাল।

৬.৩ আবার কার্নিশে বসে। - সাধারণ বর্তমান কাল।

৬.৪ এই বাজে ঘরে আছি। - সাধারণ বর্তমান কাল।

৬.৫ ইচ্ছে হলে আজই যেতে পারি। - সাধারণ বর্তমান কাল।

৭. নির্দেশ অনুসারে উত্তর দাও:

৭.১ অন্ধকার ঠোঁটে নিয়ে সন্ধ্যা ফেরে যেই সে’ও ফেরে। (সরল বাক্যে)
উত্তর: অন্ধকার ঠোঁটে নিয়ে সন্ধ্যা ফিরলে সে-ও ফেরে।

৭.২ কখনো সে কাছাকাছি কৌতূহলী দুই চোখ মেলে অবাক দৃষ্টিতে দেখে। (নির্দেশাত্মক শব্দের বিশেষণের রূপ লিখে বাক্যটি আবার লেখো।)
উত্তর: কখনো সে কাছাকাছি দুটি কৌতূহলী চোখ মেলে অবাক দৃষ্টিতে দেখে।

৭.৩ আমাকেই দেবেন বিধাতা। (না-সূচক বাক্যে)
উত্তর: আমাকে ছাড়া আর কাউকেই বিধাতা দেবেন না।

৭.৪ এই বাজে ঘরে আছি নিতান্ত মায়ার শরীর আমার তাই। (জটিল বাক্যে)
উত্তর: যেহেতু আমার শরীর নিতান্ত মায়ার, তাই এই বাজে ঘরে আছি।

৭.৫ ইচ্ছে হলে আজই যেতে পারি এ পাড়ায় ও পাড়ায় পালেদের বোসেদের বাড়ি। (জটিল বাক্যে)
উত্তর: যদি ইচ্ছে হয়, তাহলে আজই এ পাড়ায় ও পাড়ায় পালেদের বোসেদের বাড়ি যেতে পারি।

৮. নীচের শব্দগুলির ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচার করো:

চড়ুই: এটি একটি দেশি শব্দ।

ঘান: এটি 'গান' শব্দের একটি আঞ্চলিক রূপ, যেখানে 'গ' ধ্বনিটি মহাপ্রাণ 'ঘ'-তে পরিবর্তিত হয়েছে (মহাপ্রাণীভবন)।

চোখ: 'চক্ষু' (তৎসম) > 'চক্খু' (প্রাকৃত) > 'চোখ' (বাংলা) - এটি ধ্বনি পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

জানলা: পর্তুগিজ শব্দ 'Janela' থেকে আগত একটি বিদেশি শব্দ।

দোর: 'দ্বার' (তৎসম) > 'দুয়ার' > 'দোর' (বাংলা) - ধ্বনি পরিবর্তনের উদাহরণ।

ইচ্ছে: 'ইচ্ছা' (তৎসম) > 'ইচ্ছে' (বাংলা) - এখানে স্বরসংগতি ঘটেছে।

পাখি: 'পক্ষী' (তৎসম) > 'পক্খী' (প্রাকৃত) > 'পাখি' (বাংলা) - এটিও ধ্বনি পরিবর্তনের উদাহরণ।

৯. ‘চোখ’ শব্দটিকে পৃথক পৃথক অর্থে ব্যবহার করে বাক্য রচনা করো:

চোখ (অঙ্গ): ছেলেটির চোখ দুটি খুব সুন্দর।

চোখ (দৃষ্টি): চোরটির উপর চোখ রেখো।

চোখ (মনোযোগ): অংকে তোমার মোটেই চোখ নেই।

চোখ (অহংকার): টাকা হতেই লোকটার চোখ পাল্টে গেছে।

বিজ্ঞাপন