সপ্তম শ্রেণীর বাংলা সমাধান - একুশের কবিতা

WBBSE-র 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের "একুশের কবিতা" কবিতার সম্পূর্ণ সমাধান।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal

কবিতা: একুশের কবিতা

কবির নাম: আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭ – ২০২০)


কবি সম্পর্কে আলোচনা

Ashraf Siddiqui

আশরাফ সিদ্দিকী বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট কবি, লেখক এবং লোকসংস্কৃতিবিদ হিসেবে পরিচিত। 'মুকুট' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে 'বিষকন্যা', 'উত্তর আকাশের তারা', 'কাগজের নৌকা' ইত্যাদি। তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী ছিলেন এবং তাঁর লেখায় লোকজীবনের ছবি ফুটে উঠেছে।


কবিতার সারমর্ম

'একুশের কবিতা' ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনা নিয়ে লেখা। কবি পাখির ডাকের সুরের মধ্যে দিয়ে তাঁর দেশের মাটির গান, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি গানের ঐতিহ্যকে খুঁজে পান। কিন্তু হঠাৎই সেই সুর গুলির শব্দে থেমে যায়। এই গুলির শব্দ আসলে ভাষা আন্দোলনের শহিদদের আত্মত্যাগের প্রতীক। কবি দেখিয়েছেন যে, সেই রক্তের বিনিময়েই বাংলা ভাষা তার মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। আজকের দিনে যে মিছিল, সভা, মিটিং হয়, তা সেই শহিদদের আত্মদানেরই ফল। কবিতাটি একদিকে যেমন বাংলার সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির কথা বলে, তেমনই ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে।


অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর

১. 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:

ক স্তম্ভ
খ স্তম্ভ

পাখি
বাসনগুলো ঝন ঝন করে ভেঙে গেল।
মাঝিটা
পড়ল হুড়ু মুড়ু শব্দ করে।
হাওয়া
বন বন করে ঘুরছে।
নদী
সন সন করে বইছে।
কাচের
পড়ল ঝুপ ঝাপ করে।
রাস্তা
ফর ফর করে ছিঁড়ে গেল।
পাঁচিলটা
পড়ছিল ঝর ঝর করে।
বৃষ্টি
ঠং ঠং করে উঠছিল।
কাগজটা
ফুটছিল দুম দাম করে।
কয়েকটা
ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজে।

২. নীচের বিশেষ্যগুলিকে বিশেষণে ও বিশেষণগুলিকে বিশেষ্যে পরিবর্তন করে বাক্য রচনা করো:

সুর (বিশেষ্য) → সুরেলা (বিশেষণ): গায়কের সুরেলা কণ্ঠ আমাদের মুগ্ধ করে।

দেশ (বিশেষ্য) → দেশি (বিশেষণ): আমাদের উচিত দেশি জিনিস ব্যবহার করা।

মাঠ (বিশেষ্য) → মেঠো (বিশেষণ): মেঠো পথের ধারে কাশফুল ফুটে আছে।

বন (বিশেষ্য) → বুনো (বিশেষণ): সুন্দরবনে বুনো শুয়োর দেখা যায়।

নিঃস্ব (বিশেষণ) → নিঃস্বতা (বিশেষ্য): নিঃস্বতা জীবনের এক চরম অভিশাপ।

মুখর (বিশেষণ) → মুখরতা (বিশেষ্য): পাখিদের মুখরতায় ভোর হয়।

ইতিহাস (বিশেষ্য) → ঐতিহাসিক (বিশেষণ): পলাশীর যুদ্ধ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

ফুল (বিশেষ্য) → ফুলেল (বিশেষণ): বসন্তকালে ফুলেল বাতাস বয়।

৩. কারক-বিভক্তি নির্ণয় করো:

৩.১ পাখি সব করে রব।
উত্তর: 'পাখি' - কর্তৃকারকে শূন্য বিভক্তি।

৩.২ কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।
উত্তর: 'কাননে' - অধিকরণ কারকে 'এ' বিভক্তি।

৩.৩ তাই তো সহস্র পাখির কলতানে আজ দিগন্ত মুখর।
উত্তর: 'কলতানে' - করণ কারকে 'এ' বিভক্তি।

৩.৪ যিনি বাংলাভাষায় কথা বলতে বড়ো ভালোবাসেন।
উত্তর: 'বাংলাভাষায়' - অধিকরণ কারকে 'য়' বিভক্তি।

৩.৫ রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে।
উত্তর: 'মাঠে' - অধিকরণ কারকে 'এ' বিভক্তি।

৪. এক-টি-দুটি বাক্যে উত্তর দাও:

৪.১ "পাখি সব করে রব"— উদ্ধৃতাংশটি কার লেখা কোন্ কবিতার অংশ? কবিতাটি তাঁর লেখা কোন্ বইতে রয়েছে?
উত্তর: উদ্ধৃতাংশটি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের লেখা 'প্রভাতবর্ণন' কবিতার অংশ। কবিতাটি তাঁর 'শিশুশিক্ষা' (প্রথম ভাগ) বইতে রয়েছে।

৪.২ এই পঙ্‌ক্তিটি পাঠের সুরকে 'মন্ত্রের মতো' বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: ছেলেবেলায় শেখা এই কবিতার লাইনদুটি কবির মনে এতটাই গেঁথে গেছে যে, তা মন্ত্রের মতো পবিত্র এবং গভীর প্রভাব ফেলে। তাই একে 'মন্ত্রের মতো' বলা হয়েছে।

৪.৩ এই সুরকে কেন 'স্মৃতির মধুত্ভাণ্ডার' বলা হয়েছে? তা কবির মনে কোন্ স্মৃতি জাগিয়ে তোলে?
উত্তর: এই সুর কবির মনে তাঁর দেশের প্রকৃতি, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি গানের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। এই সমস্ত স্মৃতি মধুর ভাণ্ডারের মতো তাঁর মনে সঞ্চিত আছে।

৪.৪ সেই আমার দেশ-মাঠ-বন-নদী"—দুই বঙ্গ মিলিয়ে তিনটি অরণ্য ও পাঁচটি নদীর নাম লেখো।
উত্তর: তিনটি অরণ্য: সুন্দরবন, গরুমারা, জলদাপাড়া। পাঁচটি নদী: গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা।

৪.৫ টীকা লেখো: জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বিরি ধান, কথকতা, রূপকথা।
উত্তর: এগুলি সবই বাংলার লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান। জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি হলো বিভিন্ন প্রকারের লোকসংগীত। বিরি ধান এক প্রকার ধান। কথকতা হলো সুর করে গল্প বলার রীতি এবং রূপকথা হলো কাল্পনিক গল্প।

৪.৬ তোমার জানা দুটি পৃথক লোকসংগীতের ধারার নাম লেখো।
উত্তর: দুটি পৃথক লোকসংগীতের ধারা হলো বাউল এবং ভাওয়াইয়া।

৪.৭ "ইতিহাস থমকে দাঁড়িয়ে লিখে নিল সব"—'সব' বলতে এখানে কী কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'সব' বলতে এখানে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের ঘটনা, শহিদদের নাম এবং তাঁদের আত্মত্যাগের কথা বোঝানো হয়েছে।

৪.৮ "তাই তো সহস্র পাখির কলতানে আজ দিগন্ত মুখর"—'সহস্র পাখি' কাদের বলা হয়েছে?
উত্তর: এখানে 'সহস্র পাখি' বলতে বাংলা ভাষাপ্রেমী হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে বোঝানো হয়েছে, যাঁরা ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

৫. ব্যাখ্যা করো:

৫.১ 'কয়েকটি পাখি...পড়ে গেল মাটিতে'।
উত্তর: এই অংশে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহিদ হওয়া বীর সেনানীদের কথা বলা হয়েছে। কবি তাঁদেরকে গানের পাখি-র সঙ্গে তুলনা করেছেন, যাদের গান হঠাৎই গুলির শব্দে থেমে যায় এবং তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

৫.২ 'সেই শোকে কালবৈশাখীর ঝড় উঠলো আকাশে'।
উত্তর: ভাষা শহিদদের মৃত্যুতে বাংলার আকাশে-বাতাসে যে তীব্র শোক ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল, তাকেই কবি কালবৈশাখীর ঝড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

৫.৩ 'কথায় কথায় কথকতা কতো রূপকথা'।
উত্তর: এই পঙক্তির মাধ্যমে কবি বাংলার সমৃদ্ধ কথাসাহিত্য ও লোককথার ঐতিহ্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। বাংলা ভাষায় যে কত গল্প, কত রূপকথা লুকিয়ে আছে, তা তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

৫.৪ 'তাই তো আজো দ্যাখো এ মিছিলে এসে দাঁড়িয়েছেন আমার মা'।
উত্তর: এখানে 'মা' বলতে কবি দেশমাতাকে এবং সমস্ত বাংলাভাষী মায়েদের বুঝিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যেন সমস্ত মায়েরা তাঁদের সন্তানদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে আজও সামিল হন।

৬. আট-দশটি বাক্যে উত্তর দাও:

৬.১ এই কবিতায় 'পাখি'- শব্দের ব্যবহার কতখানি সার্থক হয়েছে তা কবিতার বিভিন্ন পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে আলোচনা করো।
উত্তর: 'একুশের কবিতা'য় 'পাখি' শব্দটি রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমে "পাখি সব করে রব" বলে বাংলার শান্ত, মধুর প্রকৃতি ও সংস্কৃতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পরে "কয়েকটি পাখির গান শেষ না হতেই তারা ঝরে গেল" বলে ভাষা আন্দোলনের শহিদদের বোঝানো হয়েছে। আবার "সহস্র পাখির কলতানে আজ দিগন্ত মুখর" বলে ভাষাপ্রেমী জনতাকে পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এইভাবে, 'পাখি' শব্দটি কবিতার মূল ভাব প্রকাশে অত্যন্ত সার্থক হয়েছে।

৬.২ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: কবিতাটির নাম 'একুশের কবিতা'। 'একুশ' বলতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিকে বোঝায়। এই দিনটি বাঙালির জীবনে এক ঐতিহাসিক দিন। কবিতাটিতে সেই দিনের ঘটনা, শহিদদের আত্মত্যাগ এবং বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসার কথাই বলা হয়েছে। কবিতার প্রতিটি ছত্রে একুশের চেতনা মিশে আছে। তাই কবিতাটির নামকরণ সম্পূর্ণ সার্থক ও যথাযথ।