অধ্যায় ২: ভারতীয় উপমহাদেশের আদিম মানুষ
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা জানব লক্ষ লক্ষ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে আদিম মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল। কীভাবে তারা ধীরে ধীরে যাযাবর জীবন থেকে স্থায়ী বসতিতে পৌঁছাল, সেই বিবর্তনের কথাই এখানে আলোচনা করা হয়েছে।
- আদিম মানুষের বিবর্তন: লক্ষ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে এপ (Ape) নামক লেজবিহীন বড় বানর থেকে মানুষের বিবর্তন শুরু হয়। সময়ের সাথে সাথে তারা দু-পায়ে দাঁড়াতে শেখে এবং তাদের মস্তিষ্কের আকার বড় হতে থাকে। এই আদিম মানুষদের বিভিন্ন প্রজাতি ছিল, যেমন—অস্ট্রালোপিথেকাস, হোমো হাবিলিস (দক্ষ মানুষ), হোমো ইরেকটাস (সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারা মানুষ) এবং হোমো স্যাপিয়েন্স (বুদ্ধিমান মানুষ)।
- পাথরের যুগ: আদিম মানুষ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করত, তাই এই সময়কালকে পাথরের যুগ বলা হয়। একে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:
- পুরোনো পাথরের যুগ: মানুষ শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করে খেত। তারা এবড়োখেবড়ো ও ভারী পাথরের হাতিয়ার (হাত কুঠার, চপার) ব্যবহার করত এবং গুহায় বা খোলা আকাশের নীচে থাকত।
- মাঝের পাথরের যুগ: হাতিয়ারগুলি ছোট, হালকা ও ধারালো হয়। মানুষ পশুপালন করতে শেখে এবং ছোট ছোট বসতি তৈরি করতে শুরু করে।
- নতুন পাথরের যুগ: মানুষ কৃষিকাজ শেখে এবং স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। তারা আরও উন্নত ও মসৃণ পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করত এবং মাটির পাত্র তৈরি করতে শেখে।
- আগুনের ব্যবহার: আগুন জ্বালাতে ও ব্যবহার করতে শেখা ছিল আদিম মানুষের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আগুন তাদের শীত ও বন্য জন্তুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করত। এছাড়া, আগুনে ঝলসানো নরম মাংস খাওয়ার ফলে তাদের শারীরিক গঠনেও পরিবর্তন আসে।
- উপমহাদেশে আদিম মানুষ: ভারতীয় উপমহাদেশে আদিম মানুষের পুরোনো নিদর্শন পাওয়া গেছে কাশ্মীরের সোয়ান উপত্যকা, পাকিস্তানের পটোয়ার মালভূমি, কর্ণাটকের হুন্সগি এবং মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা ও নর্মদা উপত্যকায়। ভীমবেটকার গুহাচিত্রগুলি আদিম মানুষের জীবনযাত্রা, শিকার এবং সামাজিক জীবনের অমূল্য দলিল।
গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল
| সময়কাল (আনুমানিক) | যুগ/ঘটনা |
|---|---|
| খ্রিষ্টপূর্ব ২০ লক্ষ - ১০ হাজার বছর | পুরোনো পাথরের যুগ। |
| খ্রিষ্টপূর্ব ১০ হাজার - ৮ হাজার বছর | মাঝের পাথরের যুগ। |
| খ্রিষ্টপূর্ব ৮ হাজার - ৪ হাজার বছর | নতুন পাথরের যুগ। |
| ১৯৭৪ খ্রিঃ | ইথিওপিয়ায় 'লুসি'র কঙ্কাল আবিষ্কার। |
| ১৯৫৭ খ্রিঃ | ভীমবেটকা গুহা আবিষ্কার। |
অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর
এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
সবচেয়ে পুরোনো আদিম মানুষের খোঁজ কোথায় পাওয়া গেছে?
(ক) এশিয়া (খ) ইউরোপ (গ) পূর্ব আফ্রিকা (ঘ) অস্ট্রেলিয়া
উত্তর: (গ) পূর্ব আফ্রিকা
লেজবিহীন বড় আকারের বানরদের কী বলা হত?
(ক) হোমিনিড (খ) এপ (গ) অস্ট্রালোপিথেকাস (ঘ) শিম্পাঞ্জি
উত্তর: (খ) এপ
'অস্ট্রালোপিথেকাস' কথার অর্থ কী?
(ক) দক্ষিণী বানর (খ) দক্ষ মানুষ (গ) বুদ্ধিমান মানুষ (ঘ) সোজা মানুষ
উত্তর: (ক) দক্ষিণী বানর
'হোমো হাবিলিস' কথার অর্থ কী?
(ক) বুদ্ধিমান মানুষ (খ) দক্ষ মানুষ (গ) সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারা মানুষ (ঘ) এপ
উত্তর: (খ) দক্ষ মানুষ
কোন প্রজাতির আদিম মানুষ প্রথম আগুনের ব্যবহার শিখেছিল?
(ক) অস্ট্রালোপিথেকাস (খ) হোমো হাবিলিস (গ) হোমো ইরেকটাস (ঘ) হোমো স্যাপিয়েন্স
উত্তর: (গ) হোমো ইরেকটাস
'হোমো স্যাপিয়েন্স' কথার অর্থ কী?
(ক) দক্ষ মানুষ (খ) বুদ্ধিমান মানুষ (গ) শক্তিশালী মানুষ (ঘ) আধুনিক মানুষ
উত্তর: (খ) বুদ্ধিমান মানুষ
পাথরের যুগকে প্রধানত কয়টি ভাগে ভাগ করা হয়?
(ক) দুটি (খ) তিনটি (গ) চারটি (ঘ) পাঁচটি
উত্তর: (খ) তিনটি
পুরোনো পাথরের যুগের মানুষ কী খেত?
(ক) চাষ করা ফসল (খ) রান্না করা খাবার (গ) শিকার করা পশুর কাঁচা মাংস ও ফলমূল (ঘ) দুধ ও ডিম
উত্তর: (গ) শিকার করা পশুর কাঁচা মাংস ও ফলমূল
কোন যুগে মানুষ প্রথম পশুপালন শেখে?
(ক) পুরোনো পাথরের যুগে (খ) মাঝের পাথরের যুগে (গ) নতুন পাথরের যুগে (ঘ) তাম্র-প্রস্তর যুগে
উত্তর: (খ) মাঝের পাথরের যুগে
কোন যুগে মানুষ কৃষিকাজ করতে শেখে?
(ক) পুরোনো পাথরের যুগে (খ) মাঝের পাথরের যুগে (গ) নতুন পাথরের যুগে (ঘ) লৌহ যুগেউত্তর: (গ) নতুন পাথরের যুগে
'লুসি'র কঙ্কাল কোথায় পাওয়া গেছে?
(ক) কেনিয়া (খ) তানজানিয়া (গ) ইথিওপিয়া (ঘ) মিশর
উত্তর: (গ) ইথিওপিয়া
ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে পুরোনো পাথরের অস্ত্র কোথায় পাওয়া গেছে?
(ক) নর্মদা উপত্যকা (খ) ভীমবেটকা (গ) মেহেরগড় (ঘ) কাশ্মীরের সোয়ান উপত্যকা
উত্তর: (ঘ) কাশ্মীরের সোয়ান উপত্যকা
ভীমবেটকা গুহা ভারতের কোন রাজ্যে অবস্থিত?
(ক) মহারাষ্ট্র (খ) মধ্যপ্রদেশ (গ) রাজস্থান (ঘ) কর্ণাটক
উত্তর: (খ) মধ্যপ্রদেশ
ভীমবেটকার গুহাচিত্রগুলিতে কোন দৃশ্য বেশি দেখা যায়?
(ক) চাষবাসের দৃশ্য (খ) শিকারের দৃশ্য (গ) নাচের দৃশ্য (ঘ) ঘরবাড়ির দৃশ্য
উত্তর: (খ) শিকারের দৃশ্য
হুন্সগি উপত্যকা কোথায় অবস্থিত?
(ক) মধ্যপ্রদেশ (খ) রাজস্থান (গ) মহারাষ্ট্র (ঘ) কর্ণাটক
উত্তর: (ঘ) কর্ণাটক
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
আদিম মানুষ বলতে কী বোঝো?
'আদিম' কথার অর্থ হলো খুব পুরোনো বা গোড়ার দিকের। তাই খুব পুরোনো সময়ের মানুষদের বোঝাতে 'আদিম মানুষ' কথাটি ব্যবহার করা হয়, যারা লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে বসবাস করত।
হোমিনিড বা মানুষ পরিবার কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
লক্ষ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে জঙ্গল কমে যায়। তখন এপ বা লেজবিহীন বানরের একটি দল খাবার খোঁজার জন্য গাছ থেকে মাটিতে নেমে আসে এবং দু-পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। এভাবেই ধীরে ধীরে এপ থেকে আলাদা হয়ে হোমিনিড বা মানুষ পরিবারের সূচনা হয়।
পাথরের যুগকে কয়টি ভাগে ভাগ করা হয় ও কী কী?
পাথরের যুগকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা: (১) পুরোনো পাথরের যুগ, (২) মাঝের পাথরের যুগ, এবং (৩) নতুন পাথরের যুগ।
আদিম মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখল কীভাবে?
আদিম মানুষ সম্ভবত দুর্ঘটনাবশত আগুন জ্বালাতে শিখেছিল। হয়তো পাথরের হাতিয়ার তৈরির সময় চকমকি পাথরে ঠোকাঠুকি লেগে আগুন জ্বলে উঠেছিল, অথবা শুকনো কাঠে কাঠে ঘষে তারা আগুন জ্বালিয়েছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশে পুরোনো পাথরের যুগের হাতিয়ার কোথায় কোথায় পাওয়া গেছে?
ভারতীয় উপমহাদেশে পুরোনো পাথরের যুগের হাতিয়ার কাশ্মীরের সোয়ান উপত্যকা, পাকিস্তানের পটোয়ার মালভূমি, হিমাচল প্রদেশের শিবালিক পর্বত অঞ্চল, কর্ণাটকের হুন্সগি এবং রাজস্থানের দিদওয়ানায় পাওয়া গেছে।
ভীমবেটকার গুহাচিত্রের বিষয়বস্তু কী ছিল?
ভীমবেটকার গুহাচিত্রগুলির প্রধান বিষয়বস্তু ছিল শিকার। সেখানে দলবদ্ধভাবে বা একা শিকার করার দৃশ্য আঁকা হয়েছে। এছাড়া বন্য পশু, পাখি, মাছ এবং মানুষের নানা কার্যকলাপের ছবিও পাওয়া যায়।
মাঝের পাথরের যুগের দুটি প্রত্নক্ষেত্রের নাম লেখো।
মাঝের পাথরের যুগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্র হলো উত্তরপ্রদেশের সরাই নহর রাই এবং মধ্যপ্রদেশের আদমগড়।
আদিম মানুষ যাযাবর ছিল কেন?
পুরোনো পাথরের যুগে আদিম মানুষ নিজেরা খাদ্য উৎপাদন করতে পারত না। তারা শিকার করে এবং বনের ফলমূল সংগ্রহ করে খেত। একটি অঞ্চলের খাবার ফুরিয়ে গেলে তাদের নতুন খাবারের সন্ধানে অন্য জায়গায় যেতে হত। এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বাস না করে খাবারের জন্য ঘুরে বেড়ানোর এই জীবনযাত্রাকেই যাযাবর জীবন বলে।
আদিম মানুষ কেন জোট বেঁধেছিল?
আদিম মানুষ মূলত দুটি কারণে জোট বেঁধেছিল। প্রথমত, দলবদ্ধভাবে থাকলে বন্য জন্তুর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করা সহজ হত। দ্বিতীয়ত, একা বড় পশু শিকার করা কঠিন ছিল, তাই তারা দলবেঁধে শিকার করত এবং পরে সেই খাবার নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিত।
নতুন পাথরের যুগের সবচেয়ে বড় বদল কী ছিল?
নতুন পাথরের যুগের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ বদল ছিল কৃষিকাজের সূচনা। মানুষ খাদ্য সংগ্রাহক থেকে খাদ্য উৎপাদকে পরিণত হয়, যা তাদের যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করতে সাহায্য করে।
পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ২৭)
১। সঠিক শব্দটি বেছে নিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করো:
১.১) আদিম মানুষ প্রথমে কাঁচামাংস ও ফলমূল খেত।
১.২) আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ার ছিল- ভোঁতা পাথর।
১.৩) আদিম মানুষের জীবনে প্রথম জরুরি আবিষ্কার- আগুন।
২। 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:
| ক-স্তম্ভ | খ-স্তম্ভ |
|---|---|
| কৃষিকাজ | নতুন পাথরের যুগ |
| পশুপালন | মাঝের পাথরের যুগে |
| ভীমবেটকা | মধ্যপ্রদেশ |
| হুন্সগি | কর্ণাটক |
৩। নিজের ভাষায় ভেবে লেখো (তিন/চার লাইন):
৩.১) আদিম মানুষ যাযাবর ছিল কেন?
আদিম মানুষ নিজেরা খাদ্য উৎপাদন করতে পারত না। তারা বনের ফলমূল সংগ্রহ এবং পশু শিকার করে জীবন চালাত। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের খাবার ফুরিয়ে গেলে, তাদের নতুন খাবারের সন্ধানে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হত। এই কারণেই আদিম মানুষ যাযাবর ছিল।
৩.২) আগুন জ্বালাতে শেখার পর আদিম মানুষের কী কী সুবিধা হয়েছিল?
আগুন জ্বালাতে শেখার পর আদিম মানুষের অনেক সুবিধা হয়েছিল। তারা আগুন দিয়ে নিজেদেরকে প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে রক্ষা করত, বন্য জন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচত এবং কাঁচা মাংসের বদলে আগুনে ঝলসানো নরম মাংস খেতে শুরু করে, যা তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।
৩.৩) আদিম মানুষ কেন জোট বেঁধেছিল? এর ফলে তার কী লাভ হয়েছিল?
আদিম মানুষ মূলত আত্মরক্ষা এবং খাদ্য সংগ্রহের জন্য জোট বেঁধেছিল। দলবদ্ধভাবে থাকলে হিংস্র পশুর আক্রমণ মোকাবিলা করা সহজ হত। এছাড়া, একা বড় পশু শিকার করা সম্ভব ছিল না, তাই তারা দলবেঁধে শিকার করত। এর ফলে তাদের নিরাপত্তা বাড়ে এবং খাদ্য সংগ্রহও সহজ হয়।