ষষ্ঠ শ্রেণীর বাংলা সমাধান - বাঘ

WBBSE-র 'সাহিত্যমেলা' বইয়ের "বাঘ" কবিতার সম্পূর্ণ সমাধান।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal

কবিতা: বাঘ

কবি: নবনীতা দেবসেন


কবি সম্পর্কে আলোচনা

নবনীতা দেবসেন (১৯৩৮ – ২০১৯): তিনি ছিলেন একজন স্বনামধন্য ভারতীয় বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। তাঁর বাবা ছিলেন কবি নরেন্দ্র দেব এবং মা ছিলেন কবি রাধারাণী দেবী। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করতেন। ভ্রমণকাহিনী, রম্যরচনা, এবং শিশুসাহিত্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে 'আমি অনুপম', 'নটী নবনীতা', 'ট্রাকবাহনে মাকমোহন' ইত্যাদি। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং শিশু সাহিত্যে বিদ্যাসাগর পুরস্কার পেয়েছেন।

Nabaneeta Dev Sen

কবিতার সারসংক্ষেপ

নবনীতা দেবসেনের 'বাঘ' কবিতাটি একটি ছোট্ট বাঘের ছানার শিশুসুলভ অভিমানের কথা বলে। হলুদ রঙের বাঘছানাটি পাখিদের বাসায় থাকে এবং তার মনে খুব রাগ জমেছে। তার রাগের কারণ হলো, তাদের বনটি কেবল পাখি দিয়েই ঠাসা, সেখানে শিকার করার মতো কোনো হরিণ নেই। সে ভাবে, বাঘ হয়ে জন্মে তার কী লাভ হলো যদি সে হরিণ শিকারই করতে না পারে। পাখিদের মতো আকাশে উড়ে যাওয়ার ক্ষমতাও তার নেই। এই নিয়ে তার খুব দুঃখ। যখন খিদেয় তার পেট জ্বলে যায়, তখন তার বাবা-মা তাকে কাঁকড়া আর মেনিমৎস্য ধরে এনে দেয়। কিন্তু বাঘছানার তাতে লজ্জা লাগে। অবশেষে, তার বাবা-মা তাকে বোঝায় যে সে যেন কান্নাকাটি না করে, কারণ সে বাঘের বাচ্চা, কোনো ভেড়ার বাচ্চা নয়। এই কবিতাটির মাধ্যমে কবি একটি ছোট্ট প্রাণীর দৃষ্টিকোণ থেকে তার অস্তিত্বের সংকট এবং অভিমানের কথা তুলে ধরেছেন।


এক যে ছিল ছোট্ট হলুদ বাঘ
তাদের পাখিরালয় বাসা।
তার মনে মনে জমছে কেবল রাগ —
কেন, বনটা কেবল পাখি দিয়েই ঠাসা?
মা-বাবা তার বেছেছেন এই বন
নেই যেখানে দ্বিগুণ হরিণ ছেঁড়া;
ধরবে বা কী? খাবেই বা কী? কোন
ভদ্র বাঘে হেথায় বাঁচে জ্যান্ত?
বাঘছানা কি ধরতে পারে পাখি?
যতই ঘাড়ে পড়ুক সক্কানে
পাখির সঙ্গে পেরে উঠবে নাকি?
এক মিনিটেই আকাশপথে হাওয়া!
ছোট্ট বাঘের ছোট্ট শরীর যত
লাফিয়ে ওঠে, ধরতে পাখির ছানা,
পাখিরা সব কিচমিচিয়ে তত
উড়ে পালায় ছড়িয়ে দিয়ে ডানা।
ছোট্ট বাঘের বড্ড খিদে পেটে।
কী আর করে, গেল নদীর পাড়ে।
লালচেটেঙা সব কাঁকড়া বেড়ায় হেঁটে,
লম্বা থাবায় ধরতে যদি পারে।
বাঘের ছানা জানত না তো মোটে
কাঁকড়া কেমন চিমটে ধরে দাঁড়া-য়
গর্তে থাবা দিয়েই কেঁদে ওঠে—
'ওরে বাবা! কে আমাকে ছাড়ায়?'
ছোট্ট বাঘের মস্ত হলুদ বাবা
কান্না শুনে দৌড়ে এলেন ঘাটে,
বাড়িয়ে দিলেন গোঁফ-ওঠা থাবা
এক থাবড়ায় কাঁকড়া-দাঁড়া কাটে।
খিদের পেটে বাঘের ছানা যখন
ধরতে গেল কালায় মেনিমৎস্য—
বাঘজননী লজ্জা পেলেন তখন
—'ভোঁদড় তো নোস, বাঘ যে তুই, বৎস!'
ছানার দুঃখে দুঃখ পেয়ে ভারি
বাঘ বাবা-মা বদলে নিলেন বাড়ি
সেই থেকে বাঘ যায় না পাখিরালয়
সবাই মিলে থাকে সজনেখোলায়।

অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর (হাতে কলমে)

১. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

১.১ নবনীতা দেবসেনের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের নাম কী?
উত্তর: নবনীতা দেবসেনের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের নাম 'আমি অনুপম'।

১.২ তাঁর লেখা একটি ভ্রমণকাহিনির নাম লেখো।
উত্তর: তাঁর লেখা একটি ভ্রমণকাহিনির নাম 'ট্রাকবাহনে মাকমোহন'।

২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও :

২.১ পাখিরালয়ের বাসায় কী পাওয়া যেত না?
উত্তর: পাখিরালয়ের বাসায় শিকার করার মতো কোনো হরিণ পাওয়া যেত না।

২.২ ছোট্ট বাঘ তার খিদে মেটানোর জন্য প্রথমে কী ধরতে গিয়েছিল?
উত্তর: ছোট্ট বাঘ তার খিদে মেটানোর জন্য প্রথমে পাখির ছানা ধরতে গিয়েছিল।

২.৩ ছোট্ট বাঘের বাবা-মা বাসা বদলে কোথায় গিয়েছিল?
উত্তর: ছোট্ট বাঘের বাবা-মা বাসা বদলে সজনেখোলায় গিয়েছিল।

২.৪ সুন্দরবনে বাঘ কী নামে পরিচিত?
উত্তর: সুন্দরবনে বাঘ 'রয়েল বেঙ্গল টাইগার' নামে পরিচিত।

৩. নীচের প্রশ্নগুলির সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও :

৩.১ 'ভদ্র বাঘে হেথায় বাঁচে জ্যান্ত' — বাঘছানার এমন মনে হয়েছিল কেন?
উত্তর: বাঘছানার এমন মনে হয়েছিল কারণ তাদের বনে শিকার করার মতো কোনো পশুপাখি ছিল না, শুধু পাখি ছিল, যা ধরা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

৩.২ ছোট্ট বাঘ পাখির ছানা ধরতে পারেনি কেন?
উত্তর: ছোট্ট বাঘ লাফিয়ে উঠতেই পাখিরা কিচিরমিচির করে আকাশে উড়ে পালাত, তাই সে পাখির ছানা ধরতে পারেনি।

৩.৩ বাঘের ছানা গর্তে থাবা দিয়েই কেঁদে উঠেছিল কেন?
উত্তর: বাঘের ছানা গর্তে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে কাঁকড়ার চিমটে খেয়েছিল, তাই যন্ত্রণায় কেঁদে উঠেছিল।

৩.৪ বাঘছানাকে বাবা কীভাবে কাঁকড়ার হাত থেকে রক্ষা করল?
উত্তর: বাঘছানার বাবা এক থাবায় কাঁকড়ার দাঁড়া কেটে তাকে রক্ষা করেছিল।

৩.৫ বাঘজননী লজ্জা পেয়েছিল কেন?
উত্তর: বাঘের বাচ্চা হয়ে ভোঁদড়ের মতো মেনিমৎস্য ধরতে যাওয়ায় বাঘজননী লজ্জা পেয়েছিল।

৪. উদাহরণ দেখে নীচের ছকটি সম্পূর্ণ করো :

ব্যাঘ্র > বাঘ

মৎস্য > মাছ

বৎস > বাছা

৫. সন্ধি করো :

পাখির + আলয় = পাখিরালয়

কাঁদুনি + উনি = কাঁদুনে

শব্দার্থ: পাখিরালয় — পাখিদের আশ্রয়স্থল। ছেঁড়া — ছিন্ন করা। আল্লাদেটে — লাল রং-এর পা বিশিষ্ট। দাঁড়া — কাঁকড়ার লম্বা ঠ্যাং।

৬. সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দগুলির অর্থ লেখো :

বন (অরণ্য) — বোন (ভগিনী)

পাড়ে (তীরে) — পারে (সক্ষম হয়)

বাড়ি (গৃহ) — বারি (জল)

৭. নীচের শব্দগুলির কোনটি বিশেষ্য ও কোনটি বিশেষণ খুঁজে বের করে আলাদা দুটি স্তম্ভে লেখো। তারপর বিশেষ্যগুলির বিশেষণরূপ এবং বিশেষণগুলির বিশেষ্যরূপ লেখো : মন, শরীর, সক্কালবেলা, ভদ্র, এক, পেট, রাগ।

বিশেষ্য বিশেষণ
মন ভদ্র
শরীর এক
সক্কালবেলা
পেট
রাগ

বিশেষ্য থেকে বিশেষণ:

  • মন → মানসিক
  • শরীর → শারীরিক
  • সক্কালবেলা → সক্কালের
  • পেট → পেটুক
  • রাগ → রাগী

বিশেষণ থেকে বিশেষ্য:

  • ভদ্র → ভদ্রতা
  • এক → একতা

৮. নিচের পদগুলির বিভক্তি অংশ আলাদা করে দেখাও :

৮.১ ভদ্র বাঘে হেথায় বাঁচে জ্যান্ত।
উত্তর: বাঘে = বাঘ + এ (এ বিভক্তি)

৮.২ পাখির সঙ্গে পেরে উঠবে নাকি?
উত্তর: পাখির = পাখি + র (র বিভক্তি)

৮.৩ ছোট্ট বাঘের মস্ত হলুদ বাবা।
উত্তর: বাঘের = বাঘ + এর (এর বিভক্তি)

৯. নীচের বাক্যগুলির উদ্দেশ্য ও বিধেয় অংশ ভাগ করে দেখাও :

বাক্য উদ্দেশ্য বিধেয়
৯.১ তার মনে মনে জমছে কেবল রাগ। তার মনে মনে জমছে কেবল রাগ।
৯.২ বাঘছানা কি ধরতে পারে পাখি? বাঘছানা কি ধরতে পারে পাখি?
৯.৩ লালচেটেঙা সব কাঁকড়া বেড়ায় হেঁটে। লালচেটেঙা সব কাঁকড়া বেড়ায় হেঁটে।

১০. নিজের ভাষায় উত্তর দাও :

১০.১ কবিতাটিতে দেখলাম কাঁকড়ার দাঁড়া থাকে, তোমার দেখা আর যে প্রাণীর দাঁড়া আছে তার সম্পর্কে দু-একটি বাক্য লেখো।
উত্তর: আমি চিংড়ি মাছের দাঁড়া দেখেছি। চিংড়ি মাছের মাথায় দুটি লম্বা ও শক্ত দাঁড়া থাকে যা তারা আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করে। এই দাঁড়াগুলো খুব ধারালো হয়।

১০.২ ছোট্ট বাঘ ও তার বাবা মা পাখিরালয়ে খাবারের অভাব থাকায় সজনেখালি চলে গিয়েছিল। সারা পৃথিবীতে আজ মানুষ বন কেটে ফেলায়, নির্বিচারে প্রাণীদের মেরে ফেলায় বাঘ প্রায় লুপ্ত হতে বসেছে। কীভাবে এদের রক্ষা করা যায় বা সমস্ত প্রাণীদের ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, এ সম্পর্কে তোমার মতামত জানিয়ে একটি অনুচ্ছেদ লেখো।
উত্তর: বাঘ আমাদের দেশের জাতীয় পশু এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু নির্বিচারে বন কেটে ফেলা, চোরাশিকার এবং পরিবেশ দূষণের কারণে আজ বাঘেরা বিপন্ন। বাঘেদের রক্ষা করার জন্য আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, বনভূমি ধ্বংস করা বন্ধ করতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে যাতে বাঘেরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান ফিরে পায়। দ্বিতীয়ত, চোরাশিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, 'ব্যাঘ্র প্রকল্প'-এর মতো সরকারি উদ্যোগগুলিকে আরও সক্রিয় করে তুলতে হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বাঘ সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা যদি প্রকৃতিকে ভালোবাসি এবং তার সমস্ত প্রাণীদের ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখি, তবেই আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটা টিকে থাকবে।